ঢাকা ১২:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে পুনরায় রাশেদ কবির আখন্দ: এমপি শ্যামলকে শুভেচ্ছা নবীনগরে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এসএসসিতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন অধরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তরী বাংলাদেশের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ। রাজাপুরে মরহুম জামির উদ্দিন আহমেদ’র ৩১ তম মৃত্যু বার্ষিকী পালিত সাংবাদিক ইউনিয়ন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফুলেল শুভেচ্ছা ও সৌজন্য সাক্ষাৎ ট্রাভেল এজেন্সি ফোরাম অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া (টিএএফবি) সদস্যদের সভা অনুষ্ঠিত। সরাইলে ডিপিএফ’র মতবিনিময় সভায় অনুষ্ঠিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে এসিজি-স্বাস্থ্য এর মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তরী বাংলাদেশের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ ও গাছের চারা বিতরণ।

১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬ ৪৯২ বার পড়া হয়েছে

আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়া

আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া, রাজনৈতিক, উন্নয়ন কৌশলবিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যখন তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রায় ১৭ কোটির এই দেশে তরুণদের সংখ্যা বিশাল—যা অর্থনীতির ভাষায় “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই শক্তিকে যদি দক্ষতা, নৈতিকতা এবং কর্মদক্ষতার মাধ্যমে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাই একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশগুলো তাদের তরুণ প্রজন্মকে কেবল একাডেমিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখে না। তারা নাগরিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ভাষাগত দক্ষতা এবং পেশাগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিশেষ জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও এখন সময় এসেছে একটি নতুন জাতীয় ধারণা নিয়ে ভাবার—১৭ বছর বয়সে সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক এক বছরের জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
এই প্রশিক্ষণ শেষ করার পর একজন তরুণ নাগরিক ১৮ বছর বয়সে পাবে পূর্ণ নাগরিক পরিচয়—ভোটাধিকার, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট। একই সঙ্গে সে হবে একটি দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক।

দক্ষতার সংকট: বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ  বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখের বেশি তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এদের অনেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না।
World Bank এবং International Labour Organization–এর বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো দক্ষতার ঘাটতি। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেক তরুণ বাস্তব কর্মদক্ষতা, প্রযুক্তি জ্ঞান কিংবা যোগাযোগ দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে।
অন্যদিকে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ভাষাজ্ঞান বা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তারা অনেক সময় শোষণের শিকার হয়। অথচ যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকলে এই শ্রমশক্তি দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে বিশ্বের অনেক দেশ তরুণদের শৃঙ্খলা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য জাতীয় সেবা বা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে।
Singapore–এ ১৮ বছর বয়সী নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যাশনাল সার্ভিস রয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণরা নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একইভাবে South Korea–তে তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা রয়েছে, যা তাদের কর্মজীবনে প্রবেশের আগে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো Israel। সেখানে জাতীয় সেবা তরুণদের শুধু সামরিক দক্ষতা নয়, বরং প্রযুক্তি, প্রশাসন এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ দেয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরায়েলের প্রযুক্তি খাতের দ্রুত বিকাশের পেছনে এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত মডেল বাংলাদেশে এই কর্মসূচি সামরিককেন্দ্রিক না হয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নভিত্তিক একটি নাগরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এই প্রশিক্ষণের কাঠামো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, নাগরিক শিক্ষা। এখানে শেখানো হবে সংবিধান, নাগরিক অধিকার, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ। দ্বিতীয়ত, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি স্পোকেন কোর্স বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যাতে তরুণরা বৈশ্বিক যোগাযোগে সক্ষম হয়। তৃতীয়ত, পেশাভিত্তিক শর্ট কোর্স। প্রশিক্ষণার্থীরা তাদের আগ্রহ অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা, শিল্প উৎপাদন কিংবা উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। চতুর্থত, বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ।
Bureau of Manpower Employment and Training–এর তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে যায়। তাদের জন্য নির্দিষ্ট দেশের ভাষা, আইন ও কর্মসংস্কৃতি শেখানো হলে তাদের আয় ও নিরাপত্তা অনেকাংশে বাড়বে। পঞ্চমত, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা। দুর্যোগ মোকাবিলা, দলগত নেতৃত্ব এবং মৌলিক শারীরিক প্রশিক্ষণ এই অংশে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাস্তবায়নের পথ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী নীতি কাঠামো প্রয়োজন।
প্রথমত, একটি জাতীয় শিক্ষা ও দক্ষতা কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রশিক্ষণের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি জেলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক নাগরিককে একটি জাতীয় দক্ষতা সনদ প্রদান করা।
সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব যদি এই কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয় বাড়বে।
তৃতীয়ত, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে।
চতুর্থত, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথ তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের পথে একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; তার প্রকৃত শক্তি তার মানুষ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী।
এই তরুণদের যদি দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হবে আত্মবিশ্বাসী, কর্মদক্ষ এবং বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সক্ষম। ১৭ বছর বয়সে এক বছরের বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হয়তো একটি সাহসী ধারণা। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—যেখানে প্রতিটি তরুণ নাগরিক হবে দক্ষ, সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীল।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে?

আপডেট সময় : ১১:২৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া, রাজনৈতিক, উন্নয়ন কৌশলবিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যখন তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রায় ১৭ কোটির এই দেশে তরুণদের সংখ্যা বিশাল—যা অর্থনীতির ভাষায় “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই শক্তিকে যদি দক্ষতা, নৈতিকতা এবং কর্মদক্ষতার মাধ্যমে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাই একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশগুলো তাদের তরুণ প্রজন্মকে কেবল একাডেমিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখে না। তারা নাগরিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ভাষাগত দক্ষতা এবং পেশাগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিশেষ জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও এখন সময় এসেছে একটি নতুন জাতীয় ধারণা নিয়ে ভাবার—১৭ বছর বয়সে সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক এক বছরের জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
এই প্রশিক্ষণ শেষ করার পর একজন তরুণ নাগরিক ১৮ বছর বয়সে পাবে পূর্ণ নাগরিক পরিচয়—ভোটাধিকার, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট। একই সঙ্গে সে হবে একটি দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক।

দক্ষতার সংকট: বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ  বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখের বেশি তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এদের অনেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না।
World Bank এবং International Labour Organization–এর বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো দক্ষতার ঘাটতি। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেক তরুণ বাস্তব কর্মদক্ষতা, প্রযুক্তি জ্ঞান কিংবা যোগাযোগ দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে।
অন্যদিকে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। ভাষাজ্ঞান বা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তারা অনেক সময় শোষণের শিকার হয়। অথচ যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকলে এই শ্রমশক্তি দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে বিশ্বের অনেক দেশ তরুণদের শৃঙ্খলা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য জাতীয় সেবা বা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে।
Singapore–এ ১৮ বছর বয়সী নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যাশনাল সার্ভিস রয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণরা নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একইভাবে South Korea–তে তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা রয়েছে, যা তাদের কর্মজীবনে প্রবেশের আগে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো Israel। সেখানে জাতীয় সেবা তরুণদের শুধু সামরিক দক্ষতা নয়, বরং প্রযুক্তি, প্রশাসন এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ দেয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরায়েলের প্রযুক্তি খাতের দ্রুত বিকাশের পেছনে এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত মডেল বাংলাদেশে এই কর্মসূচি সামরিককেন্দ্রিক না হয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নভিত্তিক একটি নাগরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এই প্রশিক্ষণের কাঠামো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, নাগরিক শিক্ষা। এখানে শেখানো হবে সংবিধান, নাগরিক অধিকার, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ। দ্বিতীয়ত, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি স্পোকেন কোর্স বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যাতে তরুণরা বৈশ্বিক যোগাযোগে সক্ষম হয়। তৃতীয়ত, পেশাভিত্তিক শর্ট কোর্স। প্রশিক্ষণার্থীরা তাদের আগ্রহ অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা, শিল্প উৎপাদন কিংবা উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। চতুর্থত, বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ।
Bureau of Manpower Employment and Training–এর তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে যায়। তাদের জন্য নির্দিষ্ট দেশের ভাষা, আইন ও কর্মসংস্কৃতি শেখানো হলে তাদের আয় ও নিরাপত্তা অনেকাংশে বাড়বে। পঞ্চমত, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা। দুর্যোগ মোকাবিলা, দলগত নেতৃত্ব এবং মৌলিক শারীরিক প্রশিক্ষণ এই অংশে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাস্তবায়নের পথ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী নীতি কাঠামো প্রয়োজন।
প্রথমত, একটি জাতীয় শিক্ষা ও দক্ষতা কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রশিক্ষণের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি জেলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক নাগরিককে একটি জাতীয় দক্ষতা সনদ প্রদান করা।
সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব যদি এই কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয় বাড়বে।
তৃতীয়ত, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে।
চতুর্থত, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথ তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের পথে একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; তার প্রকৃত শক্তি তার মানুষ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী।
এই তরুণদের যদি দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হবে আত্মবিশ্বাসী, কর্মদক্ষ এবং বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সক্ষম। ১৭ বছর বয়সে এক বছরের বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হয়তো একটি সাহসী ধারণা। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—যেখানে প্রতিটি তরুণ নাগরিক হবে দক্ষ, সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীল।