বিলীন হতে চলেছে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের পৈত্রিক ভিটার স্মৃতি

0
37
বিলীন হতে চলেছে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের পৈত্রিক ভিটার স্মৃতি
বিলীন হতে চলেছে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের পৈত্রিক ভিটার স্মৃতি

মাহবুব খান বাবুলঃ সরাইল থেকেঃ

সরাইলের শতাধিক বছর আগের গর্বিত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার কাজ চলছে। চিরতরে বিলীন হতে চলেছে অগ্নিযুগের অগ্নিপুরূষ বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের সরাইলের কালীকচ্ছ (বাঘবাড়ি) গ্রামের পৈত্রিক ভিটার স্মৃতি। বাড়িটির উঠোনজুড়ে চলছে বহুতল স্থাপনা নির্মাণের কাজ। তারা বলছেন ক্রয়সূত্রে জায়গাটির মালিকানা পেয়েছেন। প্রতিবাদে সেখানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। আজ বৃহস্পতিবার ওই জায়গার মালিকানার কাগজপত্র চেয়েছেন এসি ল্যান্ড ফারহানা নাসরিন। সরজমিন অনুসন্ধানে গেলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এখানে ভবন নির্মাণের ফলে মূল ভিটাটি পেছনে পড়ে যাবে। কারো চোখে আর পড়বে না উল্লাসকর দত্তের হাজারো স্মৃতি বিজড়িত ওই বাড়িটি। অথচ এই বাড়িটির প্রতিটি ইট পাথরের সাথে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস। তাই ভিটার স্মৃতি রক্ষার দাবীতে আবারও এগিয়ে এসেছেন লেখক গবেষক সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীরা। গত বুধবার কবি জয়দুল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল বাড়িটি পরিদর্শন করেছেন। তারা দেখেছেন উল্লাসকর দত্তের বাড়িটির তিন দিকে বসতি গড়ে তুলেছেন কিছু লোক। চরম অযত্নে অবহেলায় পরিত্যাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ওই বিপ্লবী নেতার পৈত্রিক ভিটাটি। গত ৮-১০ বছর আগেও বাড়ির সামনে ছিল দুটি বিশাল আকৃতির বাঘের ম্যুরাল। সে গুলোও এখন আর নেই। গত কয়েক দিন ধরে মূল ভবনটির সামনের উঠোনে চলছে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ। ফলে সড়ক সংলগ্ন বাড়িটি দেখা গেলেও ওই অগ্নিপুরূষের হাজারো স্মৃতি বিজড়িত বসত ঘরটি আর কারো নজরে আসবে না। আস্তে আস্তে সকলেরই চোখের আড়াল হয়ে যাবে বাড়িটি। অথচ গত শতাধিক বছর ধরে দেশ বিদেশের অগণিত দর্শনার্থী সাংবাদিক সাহিত্যিক লেখক ও গবেষকরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক আন্দামানে দ্বীপান্তরিত সেই পুরূষের পৈত্রিক ভিটাটি এক নজর দেখার জন্য নিয়মিতই আসছেন। আসতেন নানা বয়সের শিশু কিশোরও। একাধিক সূত্র বলছে উঠানের নির্মাণ কাজ শেষ করে দ্রূততম সময়ের মধ্যেই মূল ভিটিতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যাক্ত ভবনটি ভেঙ্গে ফেলবেন। আর তখনই স্থায়ীভাবে কবর রচনা হয়ে যেতে পারে উল্লাসকর দত্তের পৈত্রিক ভিটার ইতিহাস। সরাইলবাসী বিপ্লবী এই পুরূষের বাড়িটির স্মৃতি রক্ষার্থে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করে আসছিলেন গত ৫-৬ যুগেরও অধিক সময় ধরে। হস্তক্ষেপের দাবী করেছিলেন প্রত্নতত্ত বিভাগের। এর কোনটিই হয়নি। বাড়িটির স্মৃতি রক্ষা করে দেশ প্রেমের ইতিহাসকে জিইয়ে রাখতে গত বুধবার ওই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন একদল লেখক ও সংস্কৃতি কর্মী। উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ও জেলা সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন, উদীচী জেলা শাখার সভাপতি জহিরূল ইসলাম স্বপন, সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস রহমান, উদীচী সরাইল শাখার সভাপতি মোজাম্মেল হক পাঠান প্রমূখ। তারা বলেন, এমন অগ্নিপুরূষের বাড়িটির বেহাল দশা ও ইতিহাস ঐতিহ্যকে মাটি দেওয়ার আলামত দেখে আমাদের হৃদয়ে রক্ষক্ষরণ হচ্ছে। এমনটা হতে পারে না। তারা মাতৃভূমির জন্য আত্মত্যাগকারী বিপ্লবী পুরূষের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়িটি দ্রূত সংরক্ষণের দাবী জানিয়েছেন জেলা প্রশাসকের কাছে। সেই সাথে বাড়ির উঠানে চলমান নির্মাণ কাজ বন্ধ করারও জোর দাবী করেছেন। সরাইল প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. আইয়ুব খান ও সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুব খান বলেন, ব্রিটিশদের প্রতিরোধের আন্দোলনে সরাসরি অংশ গ্রহন পৃথিবীতে সাড়া জাগিয়েছেন। চরম নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেছেন। তার স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। নতুবা পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে যাবে এই বিপ্লবী নেতাকে। সরাইল সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ মৃধা আহমাদুল কামাল বলেন, এই ঘটনা সমগ্র উপমহাদেশের গৌরবোজ্জল একটি ইতিহাস। দেশ প্রেমের লড়াইয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে উদ্ভুদ্ধ করতে উল্লাসকর দত্তের বাড়িতে কিছু করা দরকার। প্রয়োজনে জায়গাটি অধিগ্রহন করা যেতে পারে। দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা বলেন, জাতীয় সংসদে বহুবার বর্তমান মালিককে সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে হলেও বাড়িটি সংরক্ষণ করে একটি মিউজিয়াম করার আবেদন করেছি। জেলার বর্তমান জেলা প্রশাসক দয়া করে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সদয় দৃষ্টি দিবেন। সরাইল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারহানা নাসরিন বলেন, জায়গার মালিকানা নিশ্চিত হতে ক্রয় সূত্রে মালিকানা দাবীদারদের কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলেছি। মালিকানা যাচাই বাছাই করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।
প্রসঙ্গত: ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ এপ্রিল সরাইলের কালীকচ্ছের দত্তপাড়ার এই বাড়িতেই জন্ম গ্রহন করেছিলেন বিপ্লবী এই নেতা। তার পিতার নাম দ্বিজ দাস। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ মে মুরারি পুকুর পাড়ে ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে অলিপুর বোমা মামলা নামের বিখ্যাত মামলায় উল্লাসকর ও বারীন ঘোষের ফাঁসীর আদেশ হয়। কিছুদিন পর সাজা পরিবর্তন করে আন্দামানের সেলুলার জেলে যাবৎ জীবন দ্বীপান্তরের সাজা দেয়া হয়। সেই সেলুলার জেলে উল্লাসকরকে শারীরিক নির্যাতন সইতে হয়। ফলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পেয়ে তিনি ফিরে যান কলকাতা শহরে। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। কারাদন্ড দেয়া হয় ১৮ মাসের। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাগের পর তিনি সরাইলের কালীকচ্ছ গ্রামের দত্তপাড়ায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ৬৩ বছর বয়সে উল্লাসকর বিশিষ্ট নেতা বিপিন চন্দ্র পালের বিধবা মেয়েকে বিয়ে করেন। ওই বাড়িতে ১০ বছর বসবাসের পর তিনি কলকাতায় যান। জীবনের শেষ সময়টুকু কাটান শিলচরে। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মে শিলচরেই তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here