চিকিৎসাসেবা শিকেয় তুলে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদায় সংবর্ধনা ও আনন্দ ভ্রমণ: চরম ভোগান্তিতে রোগীরা
- আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে চরম ব্যাঘাত ঘটিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিদায় সংবর্ধনা, ভুরিভোজ ও আনন্দ ভ্রমণে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ডিউটি ফাঁকি দিয়ে এসব অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় উপজেলার ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো সাধারণ রোগী, শিশু ও প্রসূতি মায়েরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুন (শনিবার) কসবা উপজেলায় মাসিক সমন্বয় সভায় যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোশারফ হোসেন, স্বাস্থ্য পরিদর্শক (অবসরপ্রাপ্ত) মনিরুল ইসলাম, নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. জসিম মাঠ পর্যায়ে ইপিআই এবং কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনের কাজ ফেলে ফুলেল শুভেচ্ছায় অংশ নেন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। উল্টো পরের সপ্তাহেই ২০ জুন (শনিবার) সদর উপজেলার মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই পরিদর্শন কাজ ফেলে স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. মোশারফ হোসেন, মো. কামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত মনিরুল ইসলাম ও এমপিইটিআই প্রদোষ কান্তি দাস সিলেটে সাদা পাথরে আনন্দ ভ্রমণে যান।
জানা যায়, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে বদলিজনিত কারণে ডা. ইসমাইল হোসেন রাহাত এবং অবসরজনিত কারণে মো. মনির হোসেন ও বশির আহমেদের বিদায় উপলক্ষে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৩৩ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ও ৪৫ জন স্বাস্থ্য সহকারী এবং নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২ জন কর্মী নিজ নিজ কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
স্থানীয়রা জানান, একযোগে এত কর্মী কর্মস্থল ত্যাগ করায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। সর্দি-কাশি, আমাশয়, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা চরম বিপাকে পড়েন। সেদিন সরকারিভাবে প্রদত্ত ২৮ ধরনের ওষুধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন সাধারণ মানুষ।
সূত্র জানায়, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে ২০২৫ সালের একটি পুরোনো ব্যানার টাঙিয়ে মাসিক সমন্বয় সভার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই বিদায় সংবর্ধনা ও ভুরিভোজে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হলেও অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য মেলেনি। এছাড়া অভিযুক্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভোল পাল্টানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে তারা আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে সুবিধা নিয়েছেন এবং বর্তমানে বিএনপির নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছেন, যা বিভিন্ন ছবি ও ফটোসেশনের মাধ্যমে সমালোচিত হচ্ছে।



সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গ্যারেজে সরকারি একটি কালো গাড়ি থাকার কথা থাকলেও সেখানে উপজেলা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাদা প্রাইভেট কারটি রাখা হয়। একই চালক দুটি গাড়িই চালান। সরকারি গাড়িটি উপজেলার বাইরে যাতায়াতসহ অননুমোদিত লোকজন ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, এলপিআরে (লিভ প্রিপারেটরি টু রিটায়ারমেন্ট) থাকা কর্মচারী মো. মনির হোসেন অফিসে নিয়মিত উপস্থিত থেকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব খাটাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এলপিআর কর্মীর প্রভাব খাটানোর বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন আমাদের অফিসে চাকরি করেছেন, তাই অফিসে আসতেই পারেন। এতে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই, তবে প্রভাব খাটানোর প্রশ্নই আসে না।” অনুষ্ঠানের ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের মাসিক মিটিংয়ে মাঝে মধ্যে মাঠকর্মীদের উৎসাহ দিতে সামান্য ডাল-ভাতের আয়োজন করা হয়। এই খরচের টাকা আমরা ডাক্তাররা মিলে বহন করেছি।” মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়া প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, “দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক ও সহকারী পরিদর্শকরা আমার আদেশের বাইরে কাজ করতে পারেন না। আমার জানা মতে তারা ডিউটির সময় অন্য কোথাও যাননি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, তার নামে বরাদ্দকৃত গাড়িটি মাঠ পর্যায়ের সরকারি কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়নি।














