বড় বাকাইলে কৃষকদল নেতা হোসেনের মামলা হামলার রাজত্ব;আতঙ্কে এলাকাবাসী
- আপডেট সময় : ১২:০৯:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ৬২৭ বার পড়া হয়েছে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়ন কৃষকদলের আহবায়ক,বড় বাকাইল গ্রামের হোসেন মিয়ার অত্যাচারে অতিষ্ঠ স্থানীয় জনগণ। মামলাবাজি, জমি ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান দখল, নারী কেলেংকারী ও মাদক কারবারের অভিযোগে অভিযুক্ত হোসেন মিয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, বড় বাকাইল গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে হোসেন মিয়া দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন দলের নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে এলাকায় তিনি জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মাসুম বিল্লাহ এবং ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাৎ হোসেন শোভনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে শাহাদাৎ শোভনের পক্ষে নিজ এলাকার ভোট কেন্দ্রে জোরালো অবস্থান নেয়ার তথ্যও মিলেছে। ছাত্রলীগ নেতা শোভনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে লিফলেট বিতরণের ছবি ইতিমধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় তদবির করে বাগিয়ে নেন ইউনিয়ন কৃষকদলের আহবায়কের পদ। পদ পাওয়ায় পর নিজের অনুসারীদের নিয়ে গঠন করেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। দলীয় এবং গোস্টিগত প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় শুরু করেন চাদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, চুনের কারখানা দখল, অবৈধ গ্যাসের বাণিজ্যসহ নানান অপকর্ম। তার বিরুদ্ধে নারীদের হেনস্তা ও চাদার বিনিময়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পুলিশি ঝামেলা থেকে প্রটেকশনের প্রতিশ্রুতি দেয়ার মতো অভিযোগও পাওয়া যায়। তার লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা হলো মাসুম, মাহফুজ, দুধ মিয়া,শহীদ, এমরান,কবির, রাসেদ,গিয়াসউদ্দিন, নজরুল, হেবজু মিয়া,ফরহাদ সহ বড়ো বাকাইল গ্রামের আরও কয়েকজন। হোসেন মিয়ার লাঠিয়াল বাহিনীর ভয়ে এলাকাবাসী সবসময় ভয়ে তটস্থ থাকে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানের দ্বিতীয় দিন সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় বড়ো বাকাইল গ্রামের বিল্লাল মিয়ার অনুপস্থিতিতে তার চুনের ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত চার শতাধিক চুনের বস্তা সরিয়ে নিচ্ছে হোসেন বাহিনী যার বাজার মূল্য পাচ লক্ষ টাকা। এসময় বিল্লাল মিয়ার স্ত্রী সাবিনা আক্তার তাদেরকে বাধা দিতে গেলে হোসেন মিয়া প্রকাশ্যে সাবিনা আক্তারকে এবং বিল্লাল মিয়ার ভাতিজা তারিফকে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে। গুরুতর আহত সাবিনা আক্তার তাৎক্ষণিকভাবে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন এবং হোসেন মিয়া ও তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেন যা এখন তদন্তাধীন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে হোসেন বাহিনীর সদস্যরা একে একে কেটে পড়ার চেষ্টা করে।ঘটনাস্থলে উপস্থিত হোসেন বাহিনীর সদস্য মাসুমের কাছে হট্টগোলের কারন জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ সভাপতি পরিচয় দেন এবং দখলকৃত চুনের ফ্যাক্টরি উদ্ধার করতে এসেছেন বলে জানান।
কার ফ্যাক্টরি কে দখল করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” এই ফ্যাক্টরির গ্যাস মহিউদ্দিন মিয়া পাওনা যা বিল্লাল মিয়া দীর্ঘদিন দখল করে রেখেছিলেন তাই আমরা উদ্ধার করে দিচ্ছি। ” যদিও ফ্যাক্টরির মালিকানা দাবিকারী মহিউদ্দিন মিয়াকে ঘটনাস্থলে খুজে পাওয়া যায় নি। হোসেন বাহিনীর আরেক সদস্য,ওয়ার্ড যুবদল নেতা মাহফুজ সাংবাদিকদের বলেন,মহিউদ্দিন মিয়া একটি বিয়ের দাওয়াতে ঢাকায় রয়েছেন। হোসেন মিয়ার কাছে চুনের ফ্যাক্টরি দখল ও জোরপূর্বক চুনের বস্তা বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,” চুনের বস্তা কারা সরিয়েছে আমি জানি না।দীর্ঘ সতেরো বছর স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনুসারীরা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন গ্যাসের কূপ দখল করে রেখেছিল,আমরা যারা বিএনপির রাজনীতি করি,সকলে মিলেমিশে এগুলো উদ্ধার করে দেয়ার চেষ্টা করতেছি।” প্রশাসনের সহায়তা না নিয়ে নিজেরাই ফ্যাক্টরি দখলের চেষ্টা আইনসিদ্ধ কি-না জানতে চাইলে তিনি এর কোন সদোত্তর দিতে পারেন নি।
অনুসন্ধানে তার ভাতিজা রাশেদুল ইসলাম বাবু ও একই গ্রামের জরিনা বেগমের বিরুদ্ধে হোসেন মিয়া একাধিক মিথ্যা মামলা দেয়ার অভিযোগ উঠে আসে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী জরিনা বেগম বলেন, “হোসেন মিয়া একজন নারীলোভী।সে বিভিন্ন জায়গায় নারীদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করতে গিয়ে একাধিকবার ধরা খেয়েছে।সে বিভিন্ন সময় আমাকেও কুপ্রস্তাব দিত। আমি রাজি না হওয়ায় সে আমার বিরুদ্ধে ১৫ লক্ষ টাকার মিথ্যা চেকের মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। “
হোসেন মিয়া কর্তৃক দখলকৃত চুন ফ্যাক্টরির প্রকৃত মালিক বিল্লাল মিয়া বলেন “ আমার চাচাতো ভাই হোসেন মিয়ার অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। সে আমার ব্যবসা দখল করে নিয়েছে। আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। রাশেদুল ইসলাম বাবুকেও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।”
হোসেনের নির্যাতনের শিকার আরেক ভুক্তভোগী সোহেল মিয়া বলেন, ” আওয়ামী লীগের কোন কমিটিতে আমার কোন পদ পদবি নাই। তারপরও হোসেন মিয়া মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমার বাড়িতে পুলিশ পাঠায়।পুলিশের হয়রানি থেকে বাচানোর কথা বলে আমার কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা দাবি করেন।আমি বাধ্য হয়ে তাকে ত্রিশ হাজার টাকা দেই।আমার ভাই রুবেল তার চাদাবাজির প্রতিবাদ করায় হোসেন মিয়া তাকে মিথ্যে মামলায় ফাসিয়ে দেয়।”
বাবু মিয়ার পরিবার সূত্রে জানা যায়, কিছু দিন আগে হোসেন মিয়া এক নারীর সঙ্গে দেখা করতে রাতের বেলা শহরের শিমরাইলকান্দি এলাকার একটি বাসায় যান।তখন স্থানীয়রা নারীসহ তাকে হাতেনাতে আটক করে। হোসেন মিয়াকে বলা হয় তার গ্রাম থেকে কেউ জিম্মাদার হিসেবে এলে তাকে ছাড়া হবে অন্যথায় তাকে ব্যাভিচারের অপরাধে পুলিশে দেয়া হবে।তখন হোসেন মিয়া তার বংশের ভাতিজা বাবু মিয়াকে ফোন দিয়ে কাকুতি মিনতি করে ঘটনাস্থলে নিয়ে যান এবং বাবুর জিম্মায় ছাড়া পান।এলাকায় এসে হোসেন মিয়া দাবি করেন নারীঘটিত ঘটনাটির পেছনে বাবু মিয়ার ইন্ধন রয়েছে। এর কিছু দিন পর হোসেন মিয়া বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বাবু মিয়া এবং তার পরিবারের কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি বানোয়াট অপহরণ মামলা করেন।
সম্প্রতি হোসেন মিয়া ও তার বাহিনীর একটি গোপন মিটিং এর রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে আসে।রেকর্ডে হোসেন মিয়ার কথাবার্তায় গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায় যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়,” আমার তিন ছেলে যারমধ্যে মেজো ছেলেটা মাদকাসক্ত। তাকে দিয়ে আমার কোন আশা নেই।তাকে হত্যা করে রাতের অন্ধকারে সিরাজ মিয়ার ছেলে বাবুর বাড়ির আঙিনায় ফেলে দিয়ে চিৎকার করে মানুষ জড়ো করবো এবং বলবো বাবু আমার ছেলেকে খুন করে ফেলছে।একবার খুনের মামলায় এলাকা ছাড়া করতে পারলে বাবুর ঘর বাড়ি, ফ্যাক্টরি দখল নিয়ে মামলা চালানো কোন ব্যাপার না। ”
এদিকে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরাও এ ঘটনাকে ‘গ্রামীণ সমাজের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তারা প্রশাসনের কাছে হোসেন মিয়ার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে রাশেদুল ইসলাম বাবুর মা জোসনা ইসলাম বাদী হয়ে হোসেন মিয়া সহ নয়জনের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন, যা তদন্তাধীন রয়েছে।
রাশেদুল ইসলাম বাবু এবং জরিনা বেগমের বিরুদ্ধে মামলাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে হোসেন মিয়া বলেন,“জরিনা বেগমের সঙ্গে আমার কিছু আর্থিক লেনদেন রয়েছে। ওই বিষয়ে আদালতে একটি মামলা চলমান আছে। তাই এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। তবে আমি অতীতে অনেকের চাপে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনীতি করেছি, বর্তমানে মজলিশপুর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি,।”
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, “রাশেদুল ইসলাম বাবু আমাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে কিছু টাকা দিয়ে আমি মুক্তি পাই। ওই ঘটনার পর বাবুর বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে একটি মামলা করেছি।”
দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় হোসেন মিয়ার নানা অপকর্মের বিষয়ে অবগত আছেন কি-না এবং তার বিরুদ্ধে কেন কোন ধরনের সাংগঠনিক ব্যাবস্থা নেয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে সদর উপজেলা কৃষক দলের আহবায়ক এমরান আহমেদ রনি বলেন,” যতটুকু শুনেছি বেশিরভাগ ঘটনাই তাদের পারিবারিক কোন্দল।তবে কেউ যদি জেলার নেতাদের নিকট লিখিত অভিযোগ দেয় আমরা খোজ খবর নিয়ে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিব।জাতীয়তাবাদী কৃষক দল কোন ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডকে সমর্থন করে না।”
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষকদলের আহবায়ক ভিপি শামিম বলেন,উনার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলে বা আমরা অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দল থেকে অবশ্যই পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
বড় বাকাইল এলাকাবাসী হোসেন মিয়ার অত্যাচার থেকে বাচতে প্রশাসনের সহায়তা কামনা করছে।


























