দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা কি বঞ্চিতই থেকে যাবেন?
- আপডেট সময় : ০৭:০৩:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ৪৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা-হামলা ও গুম-গ্রেপ্তারের চরম দুঃসময় পার করছে, ঠিক তখন রাজপথে সাহসের সঙ্গে যারা দলের পতাকা বহন করেছেন, তাদের একজন হলেন আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি বিএনপির দুর্দিনের নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতা। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও গুমের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তিনি বিএনপির আদর্শ ও রাজনীতিতে অবিচল থেকেছেন, এখনও আছেন। গত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে উত্তাল ছিল। কসবা-আখাউড়া উপজেলার বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, শ্রমিক দল, তাঁতি দল, জাসাসসহ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে নজিরবিহীন কর্মসূচি হতে দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কসবা-আখাউড়াবাসী তাদের কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ করতে পারেননি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কবীর আহমেদ ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের প্রতি দায়িত্বশীলতা, সাহসিকতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখায় তাঁর ভূমিকা স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত। বিশেষ করে ১/১১-এর পর বিএনপির ঐক্য ধরে রাখার জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া । নেতাকর্মীদের উজ্জ্বীবিত করার পাশাপাশি তাদের সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা করেছেন তিনি। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থাৎ বন্যা, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছ তিনি। তাদের চিকিৎসাসহ আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও তিনি এলাকায় নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে সহস্রাধিক পরিবারকে ঈদ উপহার বিতরণ করেছেন। সম্প্রতি এলাকাবাসীকে নিয়ে তিনি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছেন। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কবীর আহমেদ ভূঁইয়া দীর্ঘ দিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করে আসছেন। বর্তমান দেশের অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় তাঁর মতো একজন বিশেষজ্ঞকে কাজে লাগালে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। এতে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে, সমৃদ্ধ হবে দেশ ও জাতি। এক্ষেত্রে তাঁকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বভার দেওয়া হলে সেটি দেশ ও মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কারণে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া কসবা ও আখাউড়ায় একজন গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সভা-সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোই তার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।
কসবা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বারের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন আহমেদ খান বলেন, ‘দলের কঠিন সময়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন নিবেদিতপ্রাণ নেতা কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি বিএনপির তৃণমূল সংগঠনকে নতুন করে উজ্জীবিত করছেন। দলের নেতাকর্মীরা তাকে ভালোবেসে বলেন, দুর্দিনের কাণ্ডারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি ছাড়াই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৪টি সাংগঠনিক ইউনিটে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে সুসংগঠিত করে গেছেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, তাঁতি দল, শ্রমিক দল, জাসাস ও মহিলা দলের ইউনিটগুলো তার নেতৃত্বে সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে ওঠে। তার অনুপ্রেরণায় শত শত নতুন নেতাকর্মী রাজনীতিতে যুক্ত হন। বিশেষ করে করোনাকালে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাদ্য, নগদ অর্থ ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মীর পাশে দাঁড়ান। দলীয় যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। এত কিছুর পরেও তিনি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাননি। এটা এলাকাবাসীদের জন্য অনেক কষ্টের কারণ হয়ে আছে। এ ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ’
কসবা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক স্বপন বলেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের একজন অগ্রণী মুখ হিসেবে দুঃসময়ে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন নির্ভীকভাবে। এত শ্রমের বিনিময়ে দল তাকে সেইভাবে মূল্যায়ন করেননি, এটা হতাশার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাইলেই এই হতাশা কাটতে পারে।’
আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন আব্দু বলেন, ‘তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং সৎ, ত্যাগী ও মানবিক রাজনৈতিক চেতনার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা-আখাউড়া, তথা দেশের মানুষের কাছে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর সক্রিয় নেতৃত্বে বিএনপি কসবা-আখাউড়া অঞ্চলে আবারও শক্ত ভিত্তি ফিরে পেয়েছে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন। কবীর আহমেদ ভূঁইয়া বরারবই বঞ্চিত ছিলেন। আর কতকাল তিনি এমন বঞ্চিত হয়ে থাকবেন, এটিই দলের হাই কমান্ডের কাছে প্রশ্ন?’
কবীর আহমেদ ভূঁইয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও জনসম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে আখাউড়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আক্তার খান বলেন, ‘বিএনপির দুঃসময়ে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া নেতাকর্মীদের পাশে থেকে মানবতার সেবা করেছেন। মামলা-হামলা, নির্যাতনের সময় তিনি জেলে থাকা কর্মীদের পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে সহায়তা করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও কভিড-১৯-এর সময় তিনি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। প্রতি বছর হতদরিদ্র মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করে থাকেন। কৃষি, মৎস্য ও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, যুব উন্নয়ন এবং খেলাধুলার প্রসারে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। এসবের কোনো মূল্য তিনি পাননি। আমরা চাই, তার এই কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হোক। দল আজ ক্ষমতায় আছে। দলের হাই কমান্ড চাইলে, তাকে আমরা আরও উপরে দেখতে পাব। আমরা চাই, তিনি আমাদের হয়ে সংসদে কথা বলুক। তার মন্ত্রিত্ব এখন সময়ের দাবি। আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের দাবি পূরণ করবেন।’
আখাউড়া পৌর বিএনপির সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘কবীর আহমেদ ভূঁইয়া কসবার তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পাশাপাশি তিনি বিদেশগামী শ্রমিকদের সহায়তায় কাজ করেছেন এবং বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা কর্মসূচি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। সেই কাজে এখনো নিয়োজিত আছেন তিনি। তিনি মন্ত্রী হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন, তথা দেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে আমি আশা করি।’
কসবা পৌর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মামুন মিয়া বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েটের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে দেশের আন্দোলনের তথ্য অবহিত করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয় এ বিষয়ে অবগত আছে। দেশের জন্য তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না।’
আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. খোরশেদ আলম ভুঁইয়া বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে যে মানুষটি পাশে ছিলেন, সেই কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে আমরা এলাকার হয়ে সংসদে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কসবা-আখাউড়াবাসীর দুর্ভাগ্য সেই আশা পূরণ হয়নি। তাই এই ত্যাগী নেতাকে আগামী দিনে টেকনোক্রেট মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলাল উদ্দিন সরকার তুহিন বলেন, ‘দলের চরম দুর্দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা যখন নেতৃত্বশূন্য ছিল, নেতারা যখন বিদেশে, ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে অবস্থান করতেন, তখন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১৪টি ইউনিটকে সুসংঘটিত করে আন্দোলন এবং সংগ্রামে স্বশরীর উপস্থিত থেকে আন্দোলনকে বেগবান করেন। দলের প্রতিটি নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সফল সম্মেলন করেন। সেখানে দলের চেয়ারম্যান ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন। কিন্তু সম্মেলন শেষে কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে বঞ্চিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সবাই আশা করেছিল কবীর আহমেদ ভূইয়া কসবা-আখাউড়া থেকে এমপি হবেন। বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যবশত এবারও কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে বঞ্চিত করা হয়। আমি দলের কাছে কবীর আহমেদ ভূইয়ার যথাযথ মূল্যায়ন চাই। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছবে।’
আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মুসলিম উদ্দীন বলেন, ‘কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মূল্যায়ন না করলে তৃণমূল হতাশ হবে। দলের দুঃসময়ে তিনি বিএনপিকে উজ্জীবিত করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে এখনো পুরো জেলার বিএনপি ও সকল সহযোগী সংগঠন ঐক্যবদ্ধ। দলের বিপদের সময় এত সক্রিয়ভাবে কাজ করতে কলিজা লাগে। তাকে গুম করা হয়েছিল। আর উপর নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। যে কারণে তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। তাঁর হার্টের ধমনিতে দুইটি রিং পড়ানো হয়। জীবন বাজি রেখে যে নেতা মাঠে ছিলেন, তাকে বঞ্চিত করলে ভবিষ্যতে দল কোনো বিপদে পড়লে দলের জন্য ঝুঁকি নিতে কোনো নেতা বা কর্মী এগিয়ে আসবেন না। বিশেষ করে কসবা ও আখাউড়া বিএনপিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কবীর আহমেদ ভূইয়াকে যেকোনো দপ্তরের মন্ত্রিত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তিনি যোগ্য। আশা করি, দল তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে।’

















