ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল’ সিন্ডিকেট: হয়রানিতে সাধারণ গ্রাহক।
- আপডেট সময় : ০৭:০৮:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ৯০ বার পড়া হয়েছে
দালাল বা তথাকথিত ‘চ্যানেল’ ধরলেই জাদুর মতো দ্রুত কাজ হয়ে যায়, আর চ্যানেল ছাড়া নিজে করতে গেলেই পদে পদে জুটছে চরম হয়রানি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এখন অনিয়ম’ই নিয়মে পরিনত হয়েছে। উৎকোচের বিনিময়ে দালালদের মাধ্যমে জমা পড়া ফাইলে থাকা বিশেষ ‘কোড নাম্বার’ বা ‘মেইল আইডি’ দেখেই কাজ করছেন কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর এই মেইল আইডি বা কোর্ড নির্ধারন করে দেয় সেখানকার সহকারী হিসাবরক্ষক জয়নাল আবেদীন, প্রতি মাসেই এই কোর্ড বা মেইল আইডি বদলানো হয় কৌশল হিসেবে। আর যারা নিয়ম মেনে নিজে পাসপোর্ট করতে আসছেন, তাদের ‘সার্ভার সমস্যা’ সহ নানান অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হচ্ছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসের এই বিশাল সিন্ডিকেটটি মূলত নিয়ন্ত্রণ করেনই জয়নাল নামের এক কর্মকর্তা। তিনি সেখানকার সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকলেও, তার অলিখিত মূল কাজই হলো দালাল চক্র ও অফিসের ভেতরের সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করে রাখা। জয়নালের ছত্রচ্ছায়াতেই অফিসের ভেতরে খোকন, জহির ও মিজান নামে তিন জন বহিরাগত (বেসরকারি) স্টাফ হিসেবে কাজ করছেন। ওই তিন বহিরাগত স্টাফের মূল কাজ হলো দালালদের বা ‘চ্যানেলে’র ফাইলগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোন ফাইল কার কাছ থেকে এসেছে তার নিখুঁত হিসাব রাখা। দালালের মাধ্যমে আসা পাসপোর্ট আবেদন ফর্মে বিশেষ একটি ‘কোড নাম্বার’, ‘মেইল আইডি’ বা সাংকেতিক চিহ্ন থাকে। এই চিহ্ন দেখেই কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন ফাইলটি নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে এসেছে। ফলে ওই গ্রাহককে কোনো লাইনে দাঁড়াতে বা হয়রানি পোহাতে হয় না।
জানা যায়, ২১টি চ্যানেল (দালাল) এর মাধ্যমে তাদের কাছে ফাইল জমা হয়। প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে দালালরা ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি হাতিয়ে নেয়। এর মধ্য থেকে প্রতিটি পাসপোর্টের বিপরীতে পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে দেওয়া হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। জয়নাল ও তার সহযোগীদের মাধ্যমেই এই অবৈধ অর্থের লেনদেন ও ভাগবাঁটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, দালাল বা চ্যানেল ছাড়া আসা সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।
১০৫ নম্বর রুমে থাকা কর্মকর্তা মোর্শেদুল হক থেকে শুরু হয় তাদের হয়রানি’ যাকে সহযোগিতা করেন নিগার সুলতানা নামে আরেক নারী কর্মকর্তা। যারা নিজে আবেদন জমা দিতে আসেন, তাদের ফর্মে একটি গোল দাগ দিয়ে বলা হয়, ‘আপনার পেশা তো এইটা না ইত্যাদি ইত্যাদি, আপনি এই পেশা দিলেন কেন? ওপরে স্যারের কাছে যান।’ এরপর ওপরে স্যারের রুম থেকে ঘুরে আসার পর বলা হয়, ‘এই কাগজগুলো নিয়ে কাল-পরশু আসেন।’ আবার কখনো ‘কাগজ নেই’, ‘সার্ভার সমস্যা’ বা ‘আজ নয় কাল আসেন’— এমন নানা অজুহাতে তাদের এক রুম থেকে অন্য রুমে ঘুরিয়ে চরম নাজেহাল করা হয়। মূলত সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি করে দালালদের কাছে যেতে বাধ্য করার জন্যই এই কৃত্রিম ভোগান্তির সৃষ্টি করে পাসপোর্ট অফিসের এই অসাধু সিন্ডিকেট।
গত ২৩ জুলাই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে ঘুষবাণিজ্য ও গ্রাহক হয়রানির খবরে সম্প্রতি জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে কয়েক জন ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন অফিস কর্মকর্তারা অনেক দুর্ব্যবহার করেন পাসপোর্ট করতে আসা সাধারণ নাগরিকদের সাথে। এবং তিনি নিজেও দেখেন যে অনেকজনকে হয়রানি করা হচ্ছে, যাদেরকে বলা হয়েছিল ৩ দিন পরে আসার জন্য, পরে তিনি বলেন যা এখন করা যায় তা ৩ দিন পরে কেন! অনেকেই তো দূর থেকে আসেন। পরে তাঁর হস্ত্যক্ষেপে কয়েক জনকে সহজে কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হয়। যা এইখানে দেয়া লিংকে দেখতে পারবেন …https://www.facebook.com/reel/1022603757214193
পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “আমরা যখন পরিদর্শনে যাই এবং সেখানে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলি, তখন তাদের চেহারায় স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করি। তারা আমাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারছিলেন না এবং স্বাভাবিক আচরণও করতে পারছিলেন না।
পাসপোর্ট করতে আসা আশুগঞ্জের বাসিন্দা তারেকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাকে এই রুম থেকে ওই রুমে শুধু ঘুরিয়েছে। পরে একসময় বলে, আপনার এটা অনলাইন হয়নি, দুই দিন পর আসেন। আমি অনেক দূর থেকে এসেছি এবং কাজ ফেলে বারবার আসা সম্ভব নয় জানালেও তারা বলে, ‘স্যার নেই, পরে দেখা যাক’। বাধ্য হয়ে পরিচিত এক বড় ভাইকে ডেকে আনি। তিনি গিয়ে বলার পর মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমার কাজটি সহজে করে দেওয়া হয়। অথচ এর আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে শুধু শুধু ঘুরিয়েছে তারা।”
বাঞ্ছারামপুর থেকে আসা মো. রনি মিয়া বলেন, “আগে যখন পাসপোর্ট করেছি তখন এত হয়রানির শিকার হইনি। বর্তমানে ভেতরে যারা কাজ করেন, তারা গ্রাহকদের একবার ওপরে, একবার নিচে পাঠিয়ে চরম নাজেহাল করেন। লাইনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা খুব ধীরগতিতে কাজ করেন। এতে আমাদের মতো দূর থেকে আসা মানুষদের বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়।”
নাসিরনগর থেকে আসা খাইরুল নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, “আমি সকাল ৯টায় অফিসে আসি। ভেতরে যাওয়ার পর ১০৫ নম্বর রুমের একজন আমার কাছে ২ হাজার টাকা দাবি করে। আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আমাকে ওপরে নিচে ঘুরিয়ে চরম হয়রানি করা হয়। পরে অফিসে একজন সাংবাদিক এলে আমি তাকে বিষয়টি জানাই। এরপর তার হস্তক্ষেপে আমার কাজটি করে দেওয়া হয়।”
এসব অনিয়ম ও হয়রানির বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির বলেন, “অফিসে কিছুটা অনিয়ম আছে, তবে আমি সবকিছু নিয়মের ভেতরে আনার চেষ্টা করছি। আমি প্রতিদিন নিজে লাইনে গিয়ে মানুষের সমস্যার কথা জানার চেষ্টা করি। কার কী সমস্যা তা জানতে সপ্তাহে একদিন গণশুনানিরও ব্যবস্থা করেছি এবং সমাধানের চেষ্টা করছি।” দালালদের সাংকেতিক কোড ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “আবেদনে কোনো কোড নাম্বার বা অন্যের ইমেইল আইডি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হয়েছে কি না বা ডুপ্লিকেট কোনো ঘটনা রয়েছে কি না তা আমি তদন্ত করে দেখব। তদন্তে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে আশা করি দ্রুতই সেটির সমাধান করব।”














