#হাঁটুর_অস্টিও_আর্থ্রাইটিসে🧪💉পিআরপি কি কার্যকর?? একাডেমিক ডিসকাশন ২(২)🧪💉

0
33


হাঁটুর অস্থিসন্ধিতে প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা বা পিআরপি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়। মনে রাখা দরকার, অস্টিওআর্থ্রাইটিসে পি.আর.পি কিন্তু কোন প্রাথমিক চিকিৎসা নয়। অন্যান্য নিয়মিত চিকিৎসার পরেও যাদের ব্যথা থাকে, তাদের জন্য পিআরপি, হাঁটুতে প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন স্টেরয়েড, হায়ালুরনিক এসিড ইঞ্জেকশন এমনকি হাঁটুর অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের বিকল্প হতে পারে।

কার্যকারিতার পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

1980 সালে সর্বপ্রথম ক্ষত নিরাময়ের জন্য পি.আর.পি ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু বর্তমানে মাস্কুলোস্কেলিটাল মেডিসিনে পি.আর.পি চমৎকার কাজ করছে। কেননা কানেকটিভ টিস্যুতে গ্রোথ অত্যন্ত কম। কারণ হচ্ছে রক্ত সঞ্চালন এবং সেলফ রিজেনারেশন কম। পি.আর.পি এই বিষয়টাকেই উদ্বুদ্ধ করে। বিশেষ করে হাঁটুর অভ্যন্তরে রক্ত নালিকা তৈরি করে সঞ্চালন বৃদ্ধি করে ও যে কোষগুলো বর্তমান, সেগুলোকে উদ্বুদ্ধ করে নতুন কোষ তৈরি করে।

প্লাটিলেট আসলে গ্রোথ ফ্যাক্টরের একটি খনি বলা চলে কারণ এটি রক্ত জমাট বাঁধা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, নতুন রক্তনালী তৈরি এবং ক্ষত নিরাময় মূল ভূমিকা পালন করে। প্লাটিলেটের আলফা গ্রানিউলস এর ভেতরে PDGF, TGF, IL, PDAF, VEGF, EGF, IGF ও Fibronectin থাকে। আসলে ডেভলপমেন্ট মেথড সিস্টেম ফর ব্লাড এন্ড সেলস CAPSS- Compact advanced platelet sequestration system অথবা PCCS- Platelet concentrate collection system এর মাধ্যমে যথাযথ মাত্রায় প্লাটিলেটের ঘনত্ব এবং ফ্যাক্টরের কনসেনট্রেশন নিশ্চিত করা যায়। রোগের মাথার উপকারিতা মূলত নির্ভর করে ইনজেকশনের মাধ্যমে যে কনসেনট্রেট দেওয়া হল তাতে কি পরিমান প্লাটিলেট এবং গ্রোথ ফ্যাক্টর বিদ্যমান রয়েছে, তার উপর। ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারি, বিভিন্ন সফট টিস্যু ডিজিজ, আঘাতজনিত ক্ষত, পোড়া রোগীর চিকিৎসা, দীর্ঘদিনের সেরে না যাওয়া ক্ষত নিরাময়, টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং, ইমপ্লান্ট সহ নানা চিকিৎসায় পিআরপি ব্যবহারের ভুরিভুরি নজির রয়েছে এবং তাদের চমৎকার কার্যকারিতা প্রমাণিত।

মানব দেহের সহজাত ক্ষয়পূরণ প্রক্রিয়ায় প্লেটিলেট অংশ নেয়। এ কারণে পি.আর.পি থেরাপি কেবল অস্টিও আর্থ্রাইটিসেই নয়, সাম্প্রতিককালে টেন্ডন, লিগামেন্ট ও অস্থিসন্ধির বিভিন্ন আঘাতে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তরান্বিত করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। লাম্বার ডিস্ক সম্পর্কিত ব্যথা, রোটেটর কাফ ইনজুরি, টেনিস এলবো, এংকেল স্প্রেইন, একিলিস টেন্ডিনাইটিস, প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস, কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম, স্যাকরো ইলিয়াক জয়েন্ট পেইনে পি.আর.পি দেয়া যেতে পারে।

হাঁটুর ব্যথায় পিআরপি কিভাবে প্রয়োগ করা হয়?

অস্টিওআর্থ্রাইটিক হাঁটুর ব্যথা স্থানে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে পিআরপি দেয়া হয়। এ পদ্ধতিতে একজন রোগীর শরীর থেকে 40 থেকে 60 মিলি রক্ত সংগ্রহ করে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনের মাধ্যমে ৩৫০০ বার ৭-৮ মিনিট ঘোরানো হয় এবং অন্যান্য উপাদান যেমন লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা থেকে অনুচক্রিকা আলাদা করা হয়। থেরাপির তিন থেকে ছয় সপ্তাহের মাঝে রোগীর হাঁটু ব্যথা কমে আসে এবং পূর্বের চেয়ে অধিক কর্মক্ষম হয়ে থাকে। যে সকল রোগীর ক্ষেত্রে পি.আর.পি কার্যকর হয়, পরবর্তীতে তাদের সর্বনিম্ন দুবার থেকে সর্বোচ্চ ছয়টি সেশন প্রয়োজন হতে পারে। থেরাপির পর ফিজিক্যাল থেরাপি দেয়া হলে অধিকতর ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

দক্ষ চিকিৎসকের অধীনে পিআরপি চিকিৎসা নিরাপদ। তবে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসার নূন্যতম ঝুঁকি যেমন সংক্রমণ, স্নায়ুর আঘাত, রক্তপাত ইত্যাদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেহেতু রোগীর নিজ দেহের রক্ত নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে পিআরপি থেরাপি দেয়া হয় সেহেতু এলার্জিক রিএ্যকশন বা অন্যান্য সংক্রমণের সম্ভাবনা কম থাকে।

সচেতনদের জন্য জানার বিষয়:

এখন পর্যন্ত যতগুলো স্টাডি হিউম্যান এন্ড মাউস কন্ট্রোল ট্রায়াল হয়েছে তাতে বিভিন্ন অঙ্গে যেমন টেনডন ও লিগামেন্ট তরুণাস্থি কার্টিলেজ ক্ষত নিরাময় সহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে একেকটা টিস্যুর জন্য এক একটি ফ্যাক্টর নির্ধারিত থাকে এবং যথাযথ কোন ফ্যাক্টরটি, আসলে কতটুকু প্রয়োজন, সে বিষয়টি আলাদাভাবে যতদিন না পর্যন্ত উদ্ধার করা না হবে, ততদিন পর্যন্ত আসলে এ ধরনের কিছু কন্ট্রোভার্শিয়াল ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও যথাযথভাবে তৈরি করা হচ্ছে কিনা, যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা এবং সবচাইতে জরুরী হচ্ছে রোগীকে যথাযথভাবে সিলেকশন করা হচ্ছে কিনা? এটির উপরেই আসলে পি.আর.পি কতটুকু কার্যকর তা নির্ভর করছে। অস্টিওআর্থ্রাইটিস সাধারণত Grade 2 তে পিআরপি সবচাইতে ভালো ফল প্রদর্শন করছে। অপরদিকে যখন হাঁটুর ক্ষয় অতিরিক্ত হয়ে যায়, Grade 3 তে বোনম্যারো স্টিমসেল দেওয়ার কথা বলা হয়। যদিও এ পদ্ধতি এখন পর্যন্ত রিকমেন্ডেড নয়। আর Grade 4 এ প্রকৃতপক্ষে রিজেনারেটিভ থেরাপি খুব বেশি কার্যকর নয়। সেক্ষেত্রে হাই টিবিয়াল অষ্টিওটমী অথবা রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি সাহায্য নিতে হবে।

পিআরপিতে রিজেনারেশন/রিপ্লেসমেন্ট হলেও বোনম্যারো/মেসেনকাইমাল স্টেম সেল যখন কোনো আঘাত প্রাপ্ত অংশে দেওয়া হয়, সেটা ওই স্থানের বর্তমান টিস্যুগুলোকে রিক্রুটমেন্ট এর মাধ্যমে কাজ করে। প্রাথমিক অবস্থায় অস্থিমজ্জা বা বোনম্যারো থেকেই এই উপাদান সংগ্রহ করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় 29 টি রিসার্চ পেপার পাবলিশ হয়েছে যার মধ্যে 13 টি ছিল অস্টিও আর্থ্রাইটিস চিকিৎসায়। যদিও রিসার্চাররা কন্ট্রোল গ্রুপ না থাকায় অনেকগুলো রিসার্চকে মেনে নিতে চান না। কিন্তু অধিকাংশ রিসার্চ পেপার এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেই লেখা হয়েছে। বিশেষ করে পেশেন্টের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে স্টিমসেল চমৎকার কার্যকারিতা প্রদর্শন করছে। অপরদিকে রিভিউ আর্টিকেলগুলো তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ জনিত সমস্যায় নানাবিধ ফলাফল প্রদর্শন করছে। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহার, ইনজেকশন এর সাথে অন্যান্য উপাদানের সংমিশ্রণ, দেওয়ার পদ্ধতি, ভিন্ন ভিন্ন রোগীদের শারীরিক অবস্থা, সবকিছু মিলিয়ে উপযোগিতা নির্ভর করে।

 

সবশেষে যে কথা বলতে হয়:

বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানি পিআরপি প্রোডাক্ট এবং এর টিপস নিয়ে নানা ধরনের ব্যবসা করছে। স্বাভাবিকভাবে ফলাফলগুলোকে তারা নিজের দিকে টানতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে পিআরপির সবচাইতে চমৎকার বিষয় হচ্ছে, এটি শরীরের নিজস্ব উপাদান থেকেই তৈরি করা যা পুনরায় শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি টিস্যুর নিজস্ব গ্রোথকে উদ্বুদ্ধ করে এবং যদি এটি প্রাথমিক অবস্থায় কাজ করে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে চমৎকার ফলাফল দিচ্ছে আর ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ যা হতে পারে যে কোন উপকার করতে না পারা। এর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। সুতরাং অস্টিওআর্থ্রাইটিক হাঁটুর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে নিঃসন্দেহে এটি একটি চমৎকার সংযোজন তাতে কোন সন্দেহ নেই।

🔸🔅🔸🔅🔸🔅🔸
ডা. মুহিব্বুর রহমান রাফে, এমডি
ফিজিয়াট্রিষ্ট এন্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন স্পেশালিস্ট
কনসালটেন্ট
ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ।
সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, ঢাকা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে