বুধবার , ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের সড়ক এখন মরণ ফাঁদ! দূর্ভোগে ১৫ গ্রামের মানুষ

 স্বপ্নের সড়ক এখন মরণ ফাঁদ! দূর্ভোগে ১৫ গ্রামের মানুষ

ডিঃব্রাঃ
নোয়াগাঁও ইউনিয়নের কুচনি-বড্ডাপাড়া সড়কের কাটানিশার থেকে তেরকান্দা। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে এসে আটকে আছে। সময়ের সাথে বেহাল হচ্ছে সড়কটি। ১৫ গ্রামের মানুষ এখন অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই চলছেন এ সড়কে। অগণিত খানাখন্দ আর কংক্রিটের নড়াচড়ায় স্বপ্নের এ সড়ক এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ব্রিজ ভেঙ্গে খালের উপর নির্মিত কাঠের ব্রিজটি এখন তলিয়ে যাবে পানির নিচে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এ সড়কে যোগাযোগ। শঙ্কা উড়িয়ে লক্ষাধিক মানুষের স্বপ্ন পূরণে দ্রূত ব্রিজ ও সড়কটির নির্মাণের দাবী দুই ইউনিয়নের বাসিন্ধাদের।

সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, তেরকান্দা- কাটানিশার। মাত্র ১.৩ কিলোমিটার সড়ক। ৩০-৪০ বছর আগে ছিল নামমাত্র কাচা রাস্তা। আঞ্চলিক ভাষায় বলা হত গুপাট। যানবাহন চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগি ছিল সড়কটি। শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে চলত কয়েক গ্রামের লোক। আর বৃষ্টি হলে সীমাহীন দূর্ভোগ। বৃদ্ধ ও অসুস্থ্য লোকজন ভয়ে যেতেন না এ সড়কে। ১০ মিনিটের পথ। অথচ ঘুরেফিরে যেতে সময় লাগত ১ ঘন্টা।

সড়কের অবস্থা বেহাল হলেও মাঝখানে লাউয়াই খালের উপর নির্মিত হয়েছিল একটি ব্রিজ। কবে হবে সড়কটি? জীবিত থাকতে দেখে যেতে পারব তো? পাকা হবে তো? যানবাহন চলবে তো? এমন সব প্রশ্ন ছিল ওই জনপদের মানুষ গুলোর। তাদের স্বপ্ন ছিল এ সড়ক একদিন পাকা হবে। হেঁসে খেলে সকলেই স্বল্প সময়ে পাড়ি দিবে এ সড়কে। এসেছে সে মাহেন্দ্র ক্ষণ। এমপি জিয়াউল হক মৃধার চেষ্টায় সড়কটি নির্মাণের টেন্ডার হয়েছে। বিলম্বে হলেও কাজও শুরূ হয়েছিল। নিয়ম অনিয়মের মধ্যে অনেক দূর এগিয়ে ছিল কাজটি।

বাকি ছিল শুধু কার্পেন্টিং। এরই মধ্যে মারা গেছেন ঠিকাদার। আটকে গেছে কাজটি। উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, ১.৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৯.১০ ফুট প্রস্থের এ সড়কটির নির্মাণ ব্যয় ১ কোটি ১২ লক্ষাধিক টাকা। কাজটি পেয়েছেন রিংকি এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাস থেকে শুরূ হয় কাজ। তখন ছিল করোনার দাফট। নিয়ম অনিয়মের মধ্যেই চলছিল নির্মাণ কাজ।

একাধিকবার কাজটি পরিদর্শন করতে এসেছেন জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী। অনিয়মের কারণে কাজটি বন্ধও রেখেছিলেন কিছু দিন। কাজটি শেষ করার কথা ছিল ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে। করোনা ও বর্ষার কারণে সময় বৃদ্ধি করা হয় ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রূয়ারি পর্যন্ত। আবার এ সড়কের উপর ৩৫ মিটার দৈর্ঘ্যের পিএসসি গার্ডার সেতু নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ৭ হাজার ৬৮৪ টাকা। কাজটি পেয়েছেন মেসার্স মৈত্রী বিল্ডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

ব্রিজের কাজটি শুরূ করার কথা ছিল ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা। আর এজন্যই মাঝখানে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল ব্রিজটিও। বিকল্প হিসেবে পাশেই খালের উপর নির্মাণ করা হয়েছে কাঠের ব্রিজ। এখন বর্ষার মৌসুম। বৃষ্টি হচ্ছে। পানি বাড়ছে। তলিয়ে যাচ্ছে খাল বিল। সড়ক ও ব্রিজ দুটি কাজই এখন বন্ধ। সড়ক নির্মাণের সময় সীমা শেষ হয়ে গেছে ৪ মাস আগেই।

ব্রিজের সময় আছে ২ মাস। দু’টি কাজই এখন অনিশ্চিত। অথচ জন গুরূত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দফতরের লোকজনের কোন মাথা ব্যাথা নেই। ওই সড়কে ঝুঁকি নিয়েই কোন রকমে চলছে কিছু যানবাহন। চলমান অবস্থায় ফুটো হয়ে যাচ্ছে মটরবাইকের চাকা। উল্টে যাচ্ছে ব্যাটারি ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা। আহত হচ্ছে যাত্রীরা। শঙ্কার মধ্যেও চলছে স্বল্প সংখ্যক নারী পুরূষ ও শিশু। মালামাল পারাপারে চরম বেকায়দা। রাস্তার করূন দশায় ভাড়াও গুণতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশী।

স্বপ্ন পূরণ হয়নি ডা: রফিকের: পল্লী চিকিৎসক মো. রফিক মিয়া (৩৫)। তেরকান্দা বাজার সংলগ্ন চার রাস্তার মোড়ে ছিল উনার একটি ফার্মেসী। গ্রামের বিভিন্ন ভাল কাজে বরাবরই এগিয়ে আসতেন রফিক। এই রাস্তার কাজটি শুরূ হওয়ার পর তিনি নিয়মিতই দেখাশুনা করতেন। কাছে গিয়ে ভুলক্রটি ধরতেন। সংশোধনের জন্য অনুরোধ করতেন। নিম্নমানের মালামাল দেখলে একটু রাগ করতেন। এ গুলো ছিল গ্রামের প্রতি রফিকের ভাল বাসার টান। তবে তার একটি স্বপ্ন ছিল।

দীর্ঘদিন পর দুই গ্রামের মাঝখানের সড়কটি হচ্ছে। কাজ শেষ হলে সড়কটি ধর্মতীর্থ এলাকার মত সৌন্দর্য্য ধারণ করবে। অন্তত দুই গ্রামের লোকজন বিকেলে প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাবে। বিধির বিধান গত ১০-১২ দিন পূর্বে হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন রফিক। দ্রূততম সময়ের মধ্যে অবস্থার অবনতি ঘটে। নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। অল্প কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে পরাজিত হন ডা: রফিক। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তেরকান্দা-কাটানিশার সড়ক ও ব্রিজ ঠিকই হবে। কিন্তু কোন দিনও দেখবেন না ডা: রফিক। এই স্বপ্নটি অপূরণীয়ই রয়ে গেল রফিকের।

জেলা যুবলীগ নেতা আইরল গ্রামের বাসিন্ধা কামরূল ইসলাম বলেন, উপজেলা সদরের যেতে মাত্র ৫ মিনিটের রাস্তা। একদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও আরেক দিকে সরাইল-নাসিরনগর সড়ক ঘুরে উপজেলায় যেতে লাগে ১ ঘন্টা। কাজটি না হওয়ায় সাধারণ লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০ টাকার ভাড়া এখন ১০০টাকা। নোয়াগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান মো. কাজল চৌধুরী বলেন, ব্রিজটি ভেঙ্গে ফেলেছে ৪ মাস আগে। সড়কের কাজও বন্ধ।

ঠিকাদার/ তার লোকজনের সাথে যোগাযোগ করলে মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছেন। রিংকি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হেলাল মিয়া মুঠোফোনে বলেন, তিনি অসুস্থ্য। হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। কাজের বিল পাননি। তাই কাজে বিলম্ব হচ্ছে। সরাইল উপজেলা প্রকৌশলী নিলুফা ইয়াছমীন বলেন, এ সড়কের কাজের বিল পিডি অফিসে জমা দেয়া হয়েছে। ব্রিজের কাজের ঠিকাদার কাজী জাহিদুল ইসলাম ফিরোজ কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই কাজে বিলম্ব হচ্ছে।

মাহবুব খান বাবুলঃ

digital

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *