বুধবার , ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সরাইলে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং দিনে নিরব রাতে সরব

 সরাইলে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং দিনে নিরব রাতে সরব

ডিঃব্রাঃ
কিশোর গ্যাং আতঙ্কে সন্ত্রস্থ ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপজেলা সরাইলের অরূয়াইল। নেতৃত্বে রয়েছে গাজী নাঈম ওরফে ছুরি নাঈম (১৯)। হত্যা চুরি ছিনতাই মাদক ডাকাতি কিছুতেই পিছিয়ে নেই তারা। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ওরা। অসহায় পিতা মাতা। প্রাণনাশ ও লাঞ্ছিতের ভয়ে মুখ খোলার সাহস করছেন না ভুক্তভোগীরা। নেতা অনেক। কিন্তু এদের বিরূদ্ধে কোন প্রতিবাদ নেই। উল্টো ওদের মদদ দিচ্ছেন গোত্র প্রধান ও স্থানীয় ২/১ জন রাজনৈতিক ব্যক্তি। নিজেদের প্রয়োজনে ওদের ব্যবহারও করছেন। গত ৮ জুন গ্যাং এর অন্যতম সদস্য সুমনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর আগে ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছে পাকশিমুলের দেলোয়ার।

দিনদিন বেপরোয়া হয়ে ওঠছে ১১-১২ সদস্যের ওই কিশোর গ্যাং। এরা নিজেদের আড়াল করতে দিনে বের হয় মুখোশ পড়ে। আর রাতে সর্বত্র থাকে সরব। সুমন নিহতের পর আত্মগোপনে চলে গেছে গ্রূপের সকলেই। তবে ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে কাঁপছেন শেল্টার দাতারা। অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে উপজেলার অরূয়াইলে জন্ম নিয়েছে কিশোর গ্যাং। টিনেজারদের নিয়ে সংগঠিত গ্যাং এর সদস্য সংখ্যা ১১-১২ জন। সহযোগি রয়েছে আরো ৫-৭ জন। গ্যাং এর নেতৃত্বে রয়েছে অরূয়াইলের শামছু মিয়ার ছেলে নাঈম। সেকেন্ড ইন কমান্ড নাসিরনগর উপজেলা গুজিয়াখাইল গ্রামের কালন মিয়া (২৫)। বর্তমানে নাঈম এলাকায় ও প্রশাসনের কিছু স্তরে ছুরি নাঈম হিসেবেই পরিচিত। গ্যাং এর অধিকাংশ সদস্যই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।

অভিভাবকদের কোন পাত্তা দেয় না তারা। অনেকে মাদকের টাকার জন্য পিতা মাতাকে লাঞ্ছিত করেছে ও করছে। গ্রূপের সকল সদস্যের কাজই হচ্ছে চুরি ছিনতাই ডাকাতি খুন খারাবিসহ সকল অপরাধ মূলক কাজ করা। রাতের অরূয়াইলের মালিক ওই বাহিনী। অধিকাংশের হাতে থাকে ধারালো ছুরি। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে সেবন করে মাদক। এরপর শুরূ করে লাফালাফি ও মাতলামি। জড়িয়ে পড়ে অপকর্মে। যাকে পায় তাকেই ধরে। অপরিচিত হলে প্রথমেই ছুরি দিয়ে একটি পোজ দেয়। পরে টাকা ও মালামাল লুট। কোন কিছুকে পরোয়া করে না তারা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, ব্যক্তি ও বিভিন্ন গ্রাম থেকে অরূয়াইলে আসা লোকজন এদের ভয়ে সর্বক্ষণ থাকেন আতঙ্কগ্রস্ত। এদের অত্যাচার নির্যাতনের কথা কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় ভুক্তভোগীদের। অরূয়াইল বাজার, অরূয়াইল-চাতলপাড় সড়ক ও পাকশিমুল সড়কে চলে তাদের সকল অপকর্ম।

সন্ধ্যার পর ওই সড়ক দুটিতে কোন পথচারী নিরাপদ নয়। ছুরি ধরে নগদ টাকা, মুঠোফোনসেট ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া এদের জন্য মামুলি ব্যাপার। তাদের টার্গেটের শিকার অনেকেই ঘটনার বর্ণনা দিতে ভয়ে কাঁপতে থাকেন। কারণ তথ্য দাতার নাম পেলে তাকে পরপারে পাঠিয়ে দিবে নাঈম বাহিনী। ১০-১২ দিন আগে কাজ শেষে রাত ১টার দিকে বাড়ি যাওয়ার পথে বারপাইকা গ্রামের রাজমিস্ত্রী জাকিরের মুঠোফোনসেট ও নগদ ১৫ হাজার টাকা নিয়েছে নাঈম বাহিনী। জনৈক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে ২০ হাজার টাকা মূল্যের মুঠোফোনসেট ও সংখ্যালঘু পরিবারের এক মহিলার কানের স্বর্ণালঙ্কারও ছিনিয়ে নিয়েছে ওই বাহিনী। গত রমজানের ঈদের আগের দিন ভোর বেলা সিএনজি ষ্ট্যান্ডে শাহিন (১৮) নামের এক কিশোরকে আটক করে নাঈম বাহিনীর ৩ সদস্য।

কিশোরের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যের ফোনসেট ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা কিশোরকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে গুরূতর আহত করে। এসব অপকর্মের বিচারের দায়িত্ব নিতে চান না কেউ। নাঈম বাহিনী চষে বেড়াচ্ছে পাকশিমুল এলাকাও। গত দেড়/দুই মাসে গরূ চুরি ও ছুরিকাঘাতে ২টি হত্যাকান্ডসহ ওই এলাকায় ১০টি অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। অপরাধ কর্মকান্ড প্রতিরোধের উদ্যেশ্যে গত মঙ্গলবার বিকেলে ধামাউড়া ঈদগাহ মাঠে সাবেক ইউপি সদস্য ছান্দালী মিয়ার সভাপতিত্বে এক সভায় বসেন গ্রামবাসী। সভায় ছুরিকাঘাত চুরি ছিনতাইয়ের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেন লোকজন। চুর সনাক্ত করে হারূন মিয়ার চুরি হওয়া গরূ ২টি উদ্ধার করে বুঝিয়ে দেয়া হয়। গরূ চুর নাঈম বাহিনীর অন্যতম সহযোগি নুরূল্লাহ সভায় না এসে পালিয়ে যায়।

চুরির ঘটনা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় নাঈম বাহিনীর মধ্যে অন্তর্দ্বন্ধ লেগে যায়। দু’গ্রূপে বিভক্ত হয়ে পড়ে ওই কিশোর গ্যাং। পরের দিন অর্থাৎ গত ৯জুন বুধবার সকালে অরূয়াইল-চাতলপাড় সড়কের শোলাকান্দি এলাকায় সুমনের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করেছেন। থানায় ইউডি মামলা হয়েছে। সুমনের বাবা নাসির মিয়া বলেন, সুমন আমার কন্ট্রোলে ছিল না। তারও একটি গ্রূপ ছিল। অতিরিক্ত মাদক সেবন করে সুমন মারা গেছে। আমাকে জ্বালিয়ে শেষ করে ফেলেছে। আমার ১৫ লাখ টাকা শেষ করেছে। কাতার পাঠিয়েছিলাম। একটি টাকাও দেয়নি। এসে পড়েছে। আমাকে মারধর করেছে। ইউএনও স্যারের কাছে তার বিরূদ্ধে অভিযোগ করেছি। তাই বাড়ি থেকে চলে গেছে। আর আসেনি।

কোথায় থাকত আমি জানি না। তার সহপাঠিরাও ভাল না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, রাতে নাঈমের নেতৃত্বে ৬-৭ জন কিশোরকে এই ব্রিজে বসে মাদক সেবন করতে দেখেছি। একে অপরের সাথে বাকবিতন্ডার শব্দও শুনেছি। সকালে দেখি ব্রিজের নিচে এক কিশোরের লাশ। সুমনের সহপাঠি দাবী করে এক কিশোর বলেন, নিহত সুমনের এনরয়েড মুঠোফোন সেট ও তার সাথে থাকা টাকা গুলো গেল কোথায়? ওইদিন রাত ১২টার পর থেকে সুমনের ফেসবুক আইডিটি বন্ধ কেন?

এসব খুঁজলেই সুমন নিহতের আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে। অরূয়াইল ইউপি আ’লীগের সম্পাদক এডভোকেট শফিকুর রহমান অপরাধ বিষয়ে সভা করার কথা স্বীকার করে বলেন, কম বয়সি ১১-১২ জনের একটি দল এলাকায় চুরি ছিনতাইয়ের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক দিন ধরে। এরা মাদকও সেবন করে। চুরি হওয়া গরূ ২টি উদ্ধারও করেছি। নুরূল্লাহর একটি ঘরে বসে রাতে ওই কিশোররা আড্ডা দেয়। তাই ওই দোকানটিও আমাদের হাতে নিয়ে এসেছি।

যা বললেন জনৈক পাহাড়াদার : সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই নিজেকে গুটিয়ে চলে যেতে চাইলেন। কারন নাঈম বাহিনীর অপকর্ম বললে প্রথমত মৃত্যুর ভয়। এরপর চাকরি চলে যাবে। পরিচয় গোপনের আশ্বাস পেয়ে বললেন, বাবা চাকরির বয়স ১২ বছর। এমন কান্ড কখনো দেখিনি। সন্ধ্যার পর অরূয়াইলের দুটি সড়ক থাকে নাঈম বাহিনীর দখলে। কারো কথা বলার সাহস নেই। অপরিচিত নারী পুরূষ হলেই প্রথমেই ছুরিকাঘাত। পরে সব ছিনিয়ে নেয়। বানিয়াচং এর এক রাজমিস্ত্রীর হাত ছুরি দিয়ে কেটে দিয়েছে। একদিন এক লোককে বাঁচাতে গিয়ে তাদের দিয়ে আমার জীবন রক্ষা করতে হয়েছে। তারা সকলেই বড় গোত্রের। তাই কেউ কথা বলেন না। বাজার কমিটি ও তাদের অভিভাবকদের জানিয়েছি। কোন বিচার নেই। শান্তনাও নেই।

কিশোর গ্যাং-এর সদস্য যারা:
স্থানীয় ভুক্তভোগিদের দেয়া তথ্য মতে অরূয়াইলে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাং-এর সদস্য ১২ জনেরও বেশী। অরূয়াইলের বিভিন্ন গ্রামের কিশোরদের সাথে রয়েছে সীমানা সংলগ্ন নাসিরনগরের ২-৩ জন কিশোর। গ্যাং এর নেতা নাঈম ওরফে ছুরি নাঈম, সেকেন্ড ইন কমান্ড গুজিয়া খাইল গ্রামের কালন।

অপর সদস্যরা হলো- বাদে অরূয়াইলের মেরাজ মিয়ার ছেলে ইকবাল (১৭), মরম আলীর ছেলে শাহ আলম (১৮), আব্দুর রহমানের ছেলে সোহেল (১৭), অরূয়াইলের ওমর আলীর ছেলে রূবেল মিয়া (২২), রাশিদ মিয়ার ছেলে দানু (২২), মহরম আলীর ছেলে কালন মিয়া (২৫), ধামাউড়ার মাহাবুর মিয়ার ছেলে সুলতান (১৮), পাকশিমুলের সাইকুল ইসলামের ছেলে বায়েজিদ (১৮), জাকির (২৭) ও বড়ইছাড়া গ্রামের ছায়েব আলীর ছেলে সাইকুল (২৩)। সহযোগিরা হলো- বরকত (২৯), কামরূল (২৭), নূরূল্লাহ (৩১) ও আক্তার (৩২)। তবে পুলিশ বলছেন গ্যাং-এর ৮ সদস্যের নাম পেয়েছেন।

নাঈমের পিতা সামছুর কান্না: ছেলের অপকর্ম অকপটে শিকার করে কাঁদতে শুরূ করলেন বৃদ্ধ সামছু মিয়া (৭০)। তিনি বলেন, নৌকা চালিয়ে সংসার চালিয়েছি। অনেক কষ্ট করেছি। গ্রামের স্কুলে একটু পড়ার পর আর স্কুলে যায়নি নাঈম। গত ৩ বছর ধরে আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। প্রথম দিকে টাকার জন্য আমাকে মারধর করত। মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখেছি ৬ মাস। জেলে রেখেছি ৪ বারে ১৬ মাস। এরপরও পারিনি। গত ৩-৪ মাস ধরে বাড়ি যায় না। কোথায় থাকে? কি করে? কিছুই জানি না।

অরূয়াইল ইউপি যুবলীগের সাবেক সম্পাদক জাবেদ আল হাসান বলেন, এখানে কিশোর গ্যাং এর অপরাধ প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় গোত্রের ছেলে হওয়াতে কেউ প্রতিবাদ করছে না। এভাবে একটি এলাকা চলতে পারে না। অরূয়াইল ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া নাঈমের নেতৃত্বে কিশোর গ্যাং এর ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের কথা স্বীকার করে বলেন, গ্রূপটি খুবই বেপরোয়া। শুধু চুরি ছিনতাই ও ডাকাতি নয়। সর্বময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘুরে। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবন করে।

অগণিত নারীকে নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছে। লজ্জা ও প্রাণনাশের ভয়ে কেউ প্রকাশ করছেন না। এদের রয়েছে গডফাদার ও মদদদাতা। তাদের বিচার হওয়া উচিত। পুলিশ ক্যাম্প না থাকার সুয়োগে তাদের অপকর্ম আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অরূয়াইল ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা এস আই মো. মিজানুর রহমান সেখানে কিশোর গ্যাং থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, আপাতত ৮ জন সদস্যের নাম পেয়েছি। এদেরকে শায়েস্তা করতে পারেন এমন লোকজন নিজেদেরকে কেন যেন আড়াল করছেন। আমরা তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

মাহবুব খান বাবুলঃ

digital

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *