বৃহস্পতিবার , ২৮শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,১২ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির: ধংসের মুখে যিনি গেয়ে চলছেন উন্নয়নের জয়গান।

 ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির: ধংসের মুখে যিনি গেয়ে চলছেন উন্নয়নের জয়গান।

ডিঃব্রাঃ ডেস্কঃ
ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার বয়স প্রায় দেড়শো বছর। ১৮৬৮ সালে স্থাপিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভাটি প্রথম শ্রেনীর। যার আয়তন ১৭.৫৮ বর্গ কিলোমিটার। ১২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই পৌরসভার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষাধিক। এই পৌরসভার প্রথম নারী মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন মিসেস নায়ার কবির। ২৮ হাজার ৫৫৪ ভোট পেয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন নায়ার কবির। এরআগে ২০১৬ সালের ২০শে মার্চ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী হিসেবে প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

ওই মেয়াদে ২’শ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা ছাড়াও ক্লীন ইমেজের কারনে পৌরবাসীর মধ্যে বিশেষ জায়গা করে নেন। পৌরসভাকে দুর্নীতি আর অনিয়ম থেকে দূরে রেখেছেন। দলীয় এবং পরিবারের প্রভাব পড়তে দেননি পৌরসভায়। সন্ত্রাস,মাদক ব্যবসায় মদত দেয়ার মতো কোন অভিযোগও উঠেনি নেই তার বিরুদ্ধে। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদেও দলের মনোনয়ন তাকেই দেয়া হয়। বিগত ২০১৬ সালে প্রথম দফায় ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। সেই অবস্থা থেকে বেড়িয়ে এসে দায়িত্ব পালনের ৫ বছরে ২’শ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন তিনি।

আর এবছর দ্বিতীয় যাত্রায় দায়িত্ব নিতে হয় খোলা আকাশের নিচে। গত ২৮শে মার্চ হেফাজত ইসলামের কর্মী সমর্থকরা পৌর ভবনে হামলা করে। ভাঙ্গচুর-আগুনে শেষ করে দেয় সবকিছু। পৌরভবন, মিলনায়তন পরিত্যক্ত। অস্থায়ী কার্যালয়ে কার্য্যক্রম চলছে পৌরসভার। ২৮শে ফেব্রূয়ারী ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ শেষে দায়িত্ব গ্রহনের প্রাক্কালে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন নায়ার কবির। তারপরও ঘুরে দাড়ানোর,পৌরবাসীকে আরো বেশী সেবা দেয়ার লক্ষ্যে অটল তিনি।

এ প্রসঙ্গে তাঁর মুখোমুখী হলে মেয়র নায়ার কবির বলেন, প্রথমবার দায়িত্ব নিয়েছিলাম ঋণের বোঝা কাধে নিয়ে। তাছাড়া পৌরবাসীও ছিলেন নানা সুযোগ-সুবিধে বঞ্চিত। রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, জলাবদ্ধতা,যানজট, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা সমস্যা। প্রথম দফা দায়িত্ব নিয়ে এসব সমস্যার চ্যালেঞ্জ করে বিগত ৫ বছর সেখান থেকে পৌরসভাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করি।

অনেক সমস্যার সমাধান করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভাকে দেশের সবচেয়ে আধুনিক পৌরসভার গঠনের জন্য যখন দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হলাম, ঠিক তখন হেফাজতের হামলায় পৌরসভার সব কিছু আগুনে পুড়ে ছাই হলো্। সমানে আমাদের সামনে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেদিয়েছি।দ্রুততম সময়ে অস্থায়ী কার্যালয়ে নির্মাণ করে সকল নাগরিক সেবা চালু করেছি। মন্ত্রাণালয় থেকে প্রকল্প বরাদ্দ আনার চেষ্টা চলছে।

বরাদ্দ পেলে পৌরসভার রাস্তা-ড্রেণ নির্মাণ জলাবদ্ধতা দূর করাসহ সকল সমস্যার সমাধান করা হবে। বক্তব্যে তিনি আরো বলেন পৌরসভার প্রধান সমস্যা ময়লা আবর্জনার সমস্যা। বাড়িঘরের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে যেখানে ১০/১৫ ট্রাক ময়লা হতো,সেখানে প্রতিদিন ৩০ ট্রাক ময়লা হয় এখন। যা অপসারন বড় এক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। তাছাড়া ময়লা আবর্জনা ডাম্পিং করার জন্যেও শহরে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তবে শহরের ছয়বাড়িয়া এলাকায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প চালু আছে। এটি হলে কিছুটা সুফল পাওয়া যাবে। শহরে সুপেয় পানি,সড়ক বাতির অবস্থা ভালো।

তবে রাস্তাঘাট ভাঙ্গাচুরা আছে। পৌরসভার নিজস্ব অর্থে এসব মেরামত করাও সম্ভব হয়না। সরকারী বরাদ্দ যা আসে সেটি এই কাজের জন্যে অপ্রতুল। আমার বিগত ৫ বছরে ইউজিপ প্রকল্প-৪ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি। এই প্রকল্পটি পাওয়া গেলে রাস্তাঘাট,ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যা নিরসন করা যাবে। শহরকে যানজট মুক্ত করা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো ছাড়াও রাস্তাঘাট কিভাবে প্রশস্থ করা যায় সেটিও আমার লক্ষ্য আছে। তবে এসব সমস্যা পৌর নাগরিকদের সাথে নিয়েই সমাধান করতে চাই।

তাছাড়া পৌরসভার পুরাতন সুপার মার্কেটটি ভেঙ্গে আমরা সেখানে আধুনিক একটি সুপার মার্কেট নির্মান করতে যাচ্ছি। এতে শহরের মানুষের কেনাকাটায় সুবিধে বৃদ্ধিপাবে। সরকারের বিভিন্ন ধরনের ভাতা সঠিকভাবে বিতরন করার লক্ষ্যে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার নেতৃস্থানীয় লোকজনের সমন্বয়ে তালিকা প্রনয়ন করে ভাতা বিতরনের ব্যবস্থা করা হয়। নারী উন্নয়ন ফেডারেশনের মাধ্যমে সেলাই, বিউটি পার্লারের কাজের প্রশিক্ষন প্রদানের মাধ্যমে অসহায়-দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্যেও কাজ করে যাচ্ছি। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পৌরবাসীকে সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

তবে নির্দিধায় এটি বলবো যে,রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বজনপ্রীতিমুক্ত হয়েই আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। হেফাজত তান্ডবে বিধ্বস্ত পৌরসভা: হেফাজতের হরতাল চলাকালে গত ২৮শে ফেব্রূয়ারী হামলা হয় পৌরসভায়। ভাঙ্গচুর-অগ্নিসংযোগের পর চালানো হয় লুটপাট। এতে পৌরসভার সবকিছু নিশ্বে:ষ হয়ে যায়। একারনে পৌরসভার সকল নাগরিক সেবা বন্ধ থাকে এক সপ্তাহের বেশী সময়। স্বাধীনতা দিবসে প্রথম হামলা হয় পৌরসভার বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে। সেখানে থাকা বঙ্গবন্ধুর ৩টি ম্যুরাল ভাঙ্গচুর করা ছাড়াও স্কয়ারের ফোয়ারাতে থাকা ৯টি সাবমার্সিবল পাম্প আগুনে পোড়ানো হয়।

পৌর মুক্তমঞ্চের গ্রানাইট পাথর,৫০টি বৈদ্যুতিক খুটি,২০টি ফ্লাড লাইট ভাঙ্গচুর করা হয়। ২৮শে মার্চ হরতাল চলাকালে হামলা হয় পৌরভবনে। ভাঙ্গচুর-লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় সেখানে। এতে ৪ তলা বিশিষ্ট পুরো পৌরভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পৌরভবনের আসবাবপত্র বলতে কোন কিছু রক্ষা পায়নি। আগুনে ছাই হয়ে যায় সব রেকর্ডপত্র। ২০টি ষ্টিলের আলমারী,২৫টি কাঠের আলমারী,১৮টি ডেস্কটপ কম্পিউটার,৫টি ল্যাপটপ,৪টি ফটোকপিয়ার মেশিন,৩৪টি টেবিল,৭টি সেক্রেটরিয়েট টেবিল,১১৫টি চেয়ার,২টনের এসি ৫টি,স্বাস্থ্য শাখার ১২টি ড্রিপ ফ্রিজ,৪টি সাধারন ফ্রিজ,ভ্যাকসিন,সিলিং ফ্যান,ষ্টোরে রক্ষিত ১০ হাজার এলইডি বাতি,৩হাজার বাতি সেড,৫০ কয়েল বৈদ্যুতিক তার,বিভিন্ন ধরনের ১৬টি গাড়ি,ইক্যুয়েপমেন্ট চেইন ডোজার ১টি,রোড রোলার ৩টি,১টি মশক নিধন গাড়ি,হাইড্রোলিক বীম লিফটার ১টি,ভেকুটেক ১টি,এক্সাভেটর ১টি,হাইড্রোলিক ড্রিলিং মেশিন ১টি,ঘাস কাটার মেশিন ২টি,মিকচার মেশিন ৩টি,ভাইবেটর ২টি ভাঙ্গচুর ও আগুনে পুড়ানো হয়।

এছাড়া ভান্ডারে রক্ষিত যানবাহনের খুচরো যন্ত্রাংশ,সংরক্ষন শাখার মালামাল,ষ্টেশনারী মালামাল,বাড়ির প্ল্যান অনুমোদনের পে-অর্ডারসহ নথি,চেক রেজিষ্টার,ইস্যু রেজিষ্টার,ক্যাশ বহি,এ্যাসেট রেজিষ্টার,সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাক্তিগত নথি ও সার্ভিস বই,সকল রেজিষ্টার,বিভিন্ন ডকুমেন্টস,ঠিকাদারের বিল-জামানতের নথিসহ বিভিন্ন মালামাল আগুনে পুড়ে যায় বলে পৌরসুত্র জানায়। পৌরসভার সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা পৌর মিলনায়তন আগুনে ভষ্ম হয়েছে।

মিলনায়তনের ৫’শ চেয়ার,২০সেট সোফা,২০টি ৫টনের এসি,১০টি ২টনের এসি এবং ১৫০টি সিলিং ফ্যান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। দেড়শো বছরের পুরনো এই পৌরসভা এখন নাম সর্বস্ব। হামলা হয় মেয়রের বাসভবনেও। এতো ধংসেযজ্ঞের পরও মিসেস নায়ার কবিরের সাহস, উদ্যমতা ও পৌরবাসীরপ্রতি তার দরদ ও দায়িত্বশীলতা মুগ্ধ করেছে সকলকে। সবার মুখেই একটি কথা “ বারবার ধংসের মুখে পড়েও, তিনি গেয়ে চলছেন উন্নয়নের জয়গান।”

digital

1 Comment

  • তার মতো মেয়র পেয়ে পৌরবাসী সত্যিই ধন্য। জয় পৌরমাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *