শুক্রবার , ২৫শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,১১ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

নাসিরনগরের রহমত আলী হত্যাকান্ড ‘স্বাক্ষী আলমগীরই হত্যাকান্ডের মূলহোতা’

 নাসিরনগরের রহমত আলী হত্যাকান্ড ‘স্বাক্ষী আলমগীরই হত্যাকান্ডের মূলহোতা’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চায়ের দোকানি রহমত আলীকে (৪৫) হত্যার অভিযোগের তীর এখন মামলার স্বাক্ষী আলমগীর চৌধুরীর (৫০) দিকে। নিহতের পরিবার ও গ্রামবাসী বলছেন এ হত্যাকান্ডের মূলহোতাই আলমগীর। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই আলমগীর নিজের সহকারিকে কৌশলে হত্যা করেছেন। ঘটনার রাতে রহমত আলীর চিৎকার আলমগীর শুনলেও তার সাথে থাকা লিয়াকত ও লিটনরা শুনেননি। মামলায় আসামী করার পরামর্শের তালিকাও নিজ হাতে তৈরী করে দিয়েছেন আলমগীর। মামলার খসড়া তৈরী করে নিজেই হয়েছেন ৮ নম্বর স্বাক্ষী।

বাদী মহব্বত আলী বলছেন মামলার বিষয় বস্তু আমি পড়িনি। আমি শুধু স্বাক্ষর করেছি। আলমগীরের কূটকৌশলেই নিহতের ছোট ভাই লিয়াকত দুই ধরণের বক্তব্য দিয়েছেন। ২৪ মে গ্রাসবাসী আলমগীরকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেলা সদর হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এখন টক অব দি নাসিরনগর । সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, রহমত আলী ও আলমগীর একই গোত্রের লোক।

আলমগীরের পেশা জায়গা জমি পরিমাপ করা (আমীনতি)। আর তার সহকারি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন রহমত আলী। আলমগীরের সাথে প্রতিবেশী ও স্বজনদের দীর্ঘদিন ধরে জায়গা সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে। রয়েছে একাধিক মামলা মোকদ্দমা। পক্ষদ্বয় একে অপরকে ঘায়েলের খেলায় মত্ত। গত ২০ মে রাতে বুড়িশ্বর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আলমগীর চৌধুরীর বাড়ির পুকুর পাড় থেকে জবাই করা অবস্থায় ৩ সন্তানের জনক রহমত আলীর লাশ উদ্ধার করেন পুলিশ। ২১ মে লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। মামলার খসড়া থেকে শুরূ করে সব কিছু করেন আলমগীর। নিজের হাতে তার প্রতিপক্ষ ১৫ জনের নামের একটি তালিকাও করেন। ওই তালিকায় ৭ জনকে যুক্ত করে মোট ২২ জনের বিরূদ্ধে নিহতের ছোট ভাই মহব্বত আলী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।

মামলায় বলা হয়েছে রহমত আলী আলমগীরের চাচাত ভাগিনা। আলী আজম চৌধুরীর সাথে আলমগীরের বিরোধ দীর্ঘদিনের। আসামীরা আলমগীরকে প্রাণে মারার সুযোগ খুঁজছিল। রহমত আলী এমন অন্যায় কাজে আসামীদের বাঁধা দিয়েছিল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা রহমতকে হত্যা করে। ২১ মে ৫ নম্বর আসামী রকিব চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়। এরপর বের হতে থাকে হত্যাকান্ডের বিভিন্ন রহস্য। গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্ধা ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে বলেন, এমন কোন হীন কাজ নেই যেটা আলমগীর করতে পারে না। আলমগীরই এ হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী ও মূলহোতা। নতুবা তিনি ১৫ জন আসামীর নাম দিবেন কেন? ঘটনার রাতে আলমগীরের আড্ডা থেকে অন্যরা না শুনলেও উনি কেন একাধিকবার বাড়ির পাশে কারো চিৎকার শুনবেন? এর কিছুক্ষণ পরই বাড়ির পাশে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রহমত আলীর লাশ দেখতে পায় লিয়াকত। সব মিলিয়ে সকলের সন্দেহের তীর এখন আলমগীরের দিকে।

ক্ষোভে গত ২৪ মে গ্রামবাসী আলমগীরকে আটক করে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেন। আহত আলমগীরকে পুলিশ প্রথমে নাসিরনগর হাসপাতালে ও পরে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। ওই হাসপাতাল থেকে এক সময় পালিয়ে যায় আলমগীর। নিহতের ছোট ভাই লিয়াকত আলী বলেন, ঘটনার রাতে ফোন করেন আলমগীর। আমি ও লিটন তার ঘরে আড্ডা দিতে ছিলাম। আলমগীর হঠাৎ করে বলে ওঠেন, চুপ কর। কে জানি চিৎকার করছে। আমরা চিৎকার শুনিনি। তিনি বারবারই বলেন চিৎকার শুনছেন। তার অনুরোধে বের হলাম। বাড়ির পাশের উঁচু জায়গায় গিয়ে দেখি ভাইয়ের লাশ পড়ে আছে।

দ্রূত সটকে গেল লিটন। আলমগীরের শিখানো কথায় ৫ জনকে দেখেছি বলেছিলাম। আসলে কথা গুলো সত্য নয়। নিহতের ভাই মামলার বাদী মহব্বত আলী বলেন, আমি লাশ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আলমগীর নিজে উদ্যোগী হয়ে মামলার সকল কাজ করেছেন। সরল-বিশ্বাসে এজাহারে স্বাক্ষর করেছি। পরে জানতে পারি তিনি ২২ জনকে আসামী করেছেন। তারা প্রায় সবাই-ই তার নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশি। তাদের সাথে আলমগীরের রয়েছে পারিবারিক বিরোধ। আমাদের সাথে তাদের কোন শত্রূতা নেই। আলমগীর বলেছেন শুধু সত্য দিয়ে মামলা হয় না। এদের আসামী না করলে মামলাই হবে না।

আমার ভাইয়ের সাথে আলমগীরের গুরূ শিষ্যের সম্পর্ক ছিল। তাই সবকিছুই বিশ্বাস করেছি। নিহতের স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৪০) বলেন, আছরের সময় মাপের কথা বলে আলমগীর আমার স্বামীকে বাড়ি থেকে ডেকে নেয়। রাত ৮টা পর্যন্ত বাড়ি ফিরেনি। ১১টার পর লাশ। মামলার ৮ নম্বর সাক্ষী আলমগীর চৌধুরীর (পলাতক) ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) উপ-পরিদর্শক জৌলুস খান পাঠানের কাছে আলমগীর পালিয়ে যাওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আলমগীর আসামী নয়। মামলার স্বাক্ষী। তাই গ্রেপ্তারের সুযোগ নেই। প্রয়োজনে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারি। পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সহ আমরা মামলাটি তদন্ত করছি। দ্রূতই হত্যার মূল রহস্য উৎঘাটন করতে পারব।

মাহবুব খান বাবুলঃ মো. আজিজুর রহমান চৌধুরীঃ নাসিরনগর থেকেঃ

digital

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *