সোমবার , ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ধর্ষণের পর ইজ্জতের মূল্য ১০ হাজার টাকা;অতপর বিয়ে

 ধর্ষণের পর ইজ্জতের মূল্য ১০ হাজার টাকা;অতপর বিয়ে

ডিঃব্রাঃ
১৩ বছর আগের কথা। সরাইলের পল্লী এলাকা পাকশিমুল ইউনিয়নের বড়ইচড়া গ্রামে বেড়ে ওঠা মেয়েটির বয়স তখন ২০ বছর। দরিদ্র পিতা মাতা বিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। ঠিকেনি দাম্পত্য জীবন। ২-৩ বছর পরই ভেঙ্গে যায় সংসার। মারা যান পিতা মাতা। কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে মেয়েটি। ছোট দু’চালা একটি টিনের ঘরে কোন রকমে জীবন-যাপন করছে। মানুষের মালপত্র মাথায় বা হাতে করে স্থানান্তর ও ঘরের কাজ করেই চলছিল তার জীবন।

এতিম ওই মেয়েটির (৩৩) উপর কু-নজর পড়ে একই গ্রামের রহমত আলীর ছেলে ৩ সন্তানের জনক নূর আলীর (৪৮)। ঘরে স্ত্রী রেখেও নূর আলী পিছু নেয় মেয়েটির। খায়েশ মিঠাতে করে নানান চলচাতুরি। কৌশলে এক সময় মেয়েটিকে ধর্ষণ করে নূর আলী। পরে দেখায় বিয়ের প্রলোভন। অসহায় অক্ষর জ্ঞানহীন মেয়েটি নারী লোভী নূর আলীর পাতানো ফাঁদে পা দেয়।

মেয়েটিকে ইচ্ছেমত ভোগ করে নূর আলী। এক সময় মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে যায়। সটকে পড়ে ধর্ষক নূর আলী। চিকিৎসকের শরানাপন্ন হয় মেয়েটি। মেডিকেল রিপোর্টে দেখা যায় মেয়েটির গর্ভের বাচ্চার বয়স ৫ মাসেরও বেশী। মেয়েটি বলে, আমার পেটের বাচ্চাটি নূর আলীর। বাচ্চা আসার আগে আমাকে বলেছে তোরে বিয়ে করূম। তোর লগে যাওয়া আসা করূম। এখন পালিয়ে গেছে। বিয়ে করছে না।

তাই আপন ভাইকে বিষয়টি জানায় ধর্ষিতা। আইনি সহায়তা নেয়ার চেষ্টা করে ভাই বোন। কিন্তু পারেনি। নূরাকে বাঁচাতে ওঠে পড়ে লেগে যায় একটি মহল। অতীতেও তারা এমনটি করে নূরাকে অপকর্ম করতে সাহস যুগিয়েছেন। এবারও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। তারা অর্থ ও জায়গার লোভ দেখিয়ে মেয়েটির গর্ভের বাচ্চাটি নষ্ট করার প্রস্তাব দেয়।

গত সোমবার থানায় আসার কথা থাকলেও তারা আসতে পারেননি। প্রভাবশালী এক জনপ্রতিনিধির লোকজন তাদেরকে আটকিয়ে সরাইল সদরের পাঠান পাড়ায় এক বাড়িতে সভায় বসেন। দীর্ঘ সময় তাদেরকে বিভিন্ন লোভ লালসা দেখিয়ে গ্রাম্য সালিস সভার মাধ্যমে ঘটনাটি নিস্পত্তি করতে রাজি করায়। পরে থানায় না এসে তারা চলে যায় গ্রামে। এর প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বড়ইচড়া গ্রামের আবু তালেবের ছেলে বিশিষ্ট ব্যবসায়ি সোহেল (২৭) ও ব্যবসায়ি হেলেম মিয়ার (৪৮) উদ্যোগে সাবেক ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিনের বাড়িতে বসে সালিস সভা।

সভায় আব্দুল খালেকের ছেলে বাচ্চু (৩৯) ও আজগর আলী মাষ্টার সহ আরো কয়েকজন সর্দার উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় প্রথমেই মেয়েটির ইজ্জতের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১০ হাজার টাকা। পরে নূর আলীর সাথে মেয়েটিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। এটা হবে তার তৃতীয় বিয়ে।

এ সভায় নূর আলীর বর্তমান (প্রথম স্ত্রী) স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই গ্রামের একাধিক ব্যক্তি ও সালিসকারক বলেন, এটা চরিত্রহীন নূর আলীর ধর্ষণের ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার সাজানো নাটক। কিছুদিন পর বাচ্চাটি নষ্ট করে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বামীর সংসার ছাড়াতে মেয়েটিকে বাধ্য করা হবে। অতীতে নূর আলীর এমন একাধিক ঘটনা আমরা দেখেছি।

লম্পট নূর আলীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা উচিত। গ্রামের একাধিক সূত্র জানায়, দেড় বছর আগে আরেকবার নূরা জোর পূর্বক এই মেয়েটিকেই ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছিল। তখনও ওই গ্রামের এই সালিসকারকরাই মেয়েটির ইজ্জতের মূল্য নির্ধারণ করেছিল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। রাত ৮টার পর পূর্বপাড়ায় নূর আলীর প্রবেশে জারী করা হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা।

পূর্বপাড়ার অনেক মহিলা ধর্ষক নূর আলীর বিচার না হলে নিজের স্বামীকে ডিভোর্স দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। এরপরও নারী লোভী নূরার যথোপযুক্ত বিচার হচ্ছে না। একই মেয়ের ইজ্জতের মূল্য এবারও নির্ধারণ হল ১০ হাজার টাকা ও বিয়ে। গত ৩-৪ বছর আগে নূরা গ্রামের পূর্বপাড়ার এক মেয়েকে জোর করে ধর্ষণ করেছিল। গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ায় বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। সেটা ছিল তার দ্বিতীয় বিয়ে।

বিয়ের কিছুদিন পর গর্ভের বাচ্চা ফেলে নির্যাতন করে মেয়েটিকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সর্দার হেলেম মিয়া ধর্ষণের ঘটনা ও রাত ২টা পর্যন্ত সালিস করার কথা স্বীকার করে বলেন, সমস্ত গ্রামের লোকজন বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিয়ে হবে। বাজার করতেও চলে গেছে। আগের বিষয়টি এমন নয়। নূর আলীর সাথে মেয়েটির কথা কাটাকাটি হয়েছিল। মেয়েটির মাথা ভেঙ্গে দিয়েছিল নূর আলী। আমরা বসে জরিমানা করেছিলাম ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। খরচ পাতি করে ৫০ হাজার টাকা সর্দারদের কাছে আছে।

মাসে হাজার খানেক টাকা মেয়েটিকে লাভ দেওয়া হয়। সালিসে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন সর্দার আলী আজগর মাষ্টারও। সোহেল নামের এক ব্যক্তি কর্তৃক নূরাকে মাসিক মাসোয়ারা দেওয়ার বিষয়টিও চাউর রয়েছে গ্রামে। সালিসের আয়োজক সেই সর্দার সোহেল মিয়ার মুঠোফোনে চেষ্টা করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ওই গ্রামের পূর্ব পাড়ার বাসিন্ধা আবদুর রহমান বলেন, গোটা গ্রাম নয়।

শুধু নির্দিষ্ট একটি মহল সালিস করেছেন। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি এ বিয়ে টিকবে না। নূরা অপকর্মের শাস্তি পায়নি। তাকে দেওয়া হয়েছে প্রমোশন। দেড় বছর আগে রাত ৮টার পর নূরার পূর্বপাড়ায় প্রবেশ নিষেধ ছিল। নিষেধ ঠিকেনি। পূর্বপাড়াই কয়েকজন নূরাকে ডেকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। অনেকে রশিকতা করে বলেন নূর আলী হচ্ছে এই গ্রামের রশো খা।

ধর্ষিতার আপন ভাই বলেন, আমরা দূর্বল। তাই অত্যাচারিত হচ্ছি বারবার। সালিসে নূর আলীর লোকজনই রায় করেছেন। আমার কোন লোক ছিল না। নিকাহ নিবন্ধনকারীর মাধ্যমে ৪ লাখ টাকার দেন মোহরে বুধবার বিয়ে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে আমি মানব না। সরাইল থানার উপপরিদর্শক (এস আই) মো. হোসনে মোবারক বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় শান্তি শৃঙ্খলার লক্ষে গ্রামবাসী বসে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৪ লাখ টাকা দেনমোহরে গতকাল বিয়ের আয়োজন চলছে।

মাহবুব খান বাবুলঃ

digital

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *