খোকনের জন্য শোকগাথা ” শামীমুল হক “

0

সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকত। মানুষকে আপন করে নেয়ার এক যাদুকর ছিলেন। অমায়িক ব্যবহার, কাজের প্রতি ভালোবাসা, বিনয়ী এবং আস্তে কথা বলা তার বহু গুণের মধ্যে ছিল অন্যতম। বলছিলাম সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকনের কথা। ভয়ঙ্কর করোনা প্রথম কোন সাংবাদিক হিসেবে খোকনকে বেছে নিয়েছে । শোকের সাগরে ভাসিয়ে গেছে গোটা সাংবাদিক সমাজকে। গণমাধ্যমে করোনার থাবা পড়েছে আগেই। এবার ডেকে আনলো মৃত্যু।

খোকনের সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ দৈনিক মানবজমিন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রঙ্গিন ট্যাবলয়েড হিসেবে মানবজমিনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ১৯৯৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবজমিন আত্মপ্রকাশ হওয়ার কিছুদিন পর খোকন যোগ দেন এখানে। মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর হাত ধরে খোকন জয়েন করেন। প্রথমে ডেস্কে, পরে চাকরির খবর নামে একটি পেজের দায়িত্ব পান। বছর খানেক পর যোগ দেন রিপোর্টিং বিভাগে। শুরু হয় তার রিপোর্টার হিসেবে পথচলা। পরিশ্রমী, সৎ, সাহসী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। মাস তিনেক আগের কথা। মানবজমিন কার্যালয়ে হাজির। প্রধান সম্পাদকের রুমে প্রবেশ করেন। দীর্ঘক্ষণ পর বেরিয়ে আসেন আমার কাছে। শামীম ভাই, কেমন আছেন? আরে খোকন! ভাল। আপনি কেমন আছেন? সেদিনও খোকন বললেন, ভাই আমার পথচলায় মানবজমিন- এর ভূমিকা অপরিসীম।

বলতে গেলে মতি ভাই ( মতউর রহমান চৌধুরী) আমার জীবন পাল্টে দিয়েছেন। সেদিন রিপোর্টিংয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়ে আমার গতিপথ বদলে দিয়েছেন। কেন জানি সেদিন মানবজমিনে যোগ দেয়ার কথা নিজ থেকেই বলতে থাকেন। খোকন জানান, আমি একজনের রেফারেন্সে মতি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। এক দেখাতেই চাকরি হয়ে যাবে কোনদিনও বিশ্বাস করিনি। সহকর্মী হিসেবে খোকনকে কাছ থেকে দেখেছি। বাংলামটরের ওয়ালসো টাওয়ারে তখন অফিস। একই রুমে বসতাম আমরা। একসঙ্গে চা খেতে যাওয়া, অবসরে গল্প করা, রিপোর্ট লিখে দেখানো এটা ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন কাজ। এক সময় যোগ দেন আমাদের সময় পত্রিকায়। সেখান থেকে সময়ের আলোর নগর সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির গত নির্বাচনের সময়ও আসেন মানবজমিন কার্যালয়ে। সঙ্গে সাংগঠনিক সমপাদক প্রার্থী হাবিবুর রহমান। অধিকার নিয়ে সেদিন বলেছিলেন, শামীম ভাই, হাবিবের জন্য ভোট চাইতে এসেছি।

নির্বাচনে হাবিব জয়ী হওয়ার পর ফোনে কৃতজ্ঞতাও জানান। সব পর্যায়ের সাংবাদিকের সঙ্গেই খোকনের ছিল মধুর সম্পর্ক। তার মৃত্যুর পর প্রমান করে দিয়ে গেছে সে কত জনপ্রিয় ছিল।মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু সংবাদ শুনে চমকে উঠি। স্তব্ধ হয়ে যাই শোকে। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। এটা কি শুনলাম? এভাবে খোকন চলে গেলো? একে একে তার সঙ্গে আমার নানা স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শাবান মাহমুদ খোকনের অবস্থা ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানাচ্ছিলেন। একবার হাসপাতালে ভর্তির করুন আকুতি ও সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। পরে উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি ও আইসিওতে থাকার
তথ্য জানান। সবার দোয়া কামনা করেন। রাত ১০ টার পর শেষ স্ট্যাটাস -বাঁচাতে পারলামনা বন্ধু খোকনকে। খোকনের এমন অপ্রত্যাশিত মৃত্যু শোক সাগরে ভাসিয়ে গেছে সাংবাদিক সমাজকে। গণমাধ্যম পরিবারকে। গুমরে কাঁদছে সবাই। ফেসবুকের পাতায় শুধু খোকন আর খোকনের ছবি। তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান এ শোক সইবে কি করে?

মহান আল্লাহ তার পরিবারকে এ শোক সইবার শক্তি দিক। পরপারে ভাল থাকুন খোকন।

নির্বাহী সম্পাদক
দৈনিক মানবজমিন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে