মঙ্গলবার , ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এক শিকলে তালাবদ্ধ দুই শিশু শিক্ষার্থী শিক্ষক বলছেন এটাই নিয়ম!

 এক শিকলে তালাবদ্ধ দুই শিশু শিক্ষার্থী শিক্ষক বলছেন এটাই নিয়ম!

ডিঃব্রাঃ
রিমন (০৮) ও নয়ন (০৭) নামের দুই শিশু শিক্ষার্থী। এক শিকলেই তালাবদ্ধ তারা দু’জন। রিমনের ডান পায়ে ও নয়নের বাম পায়ে তালাবদ্ধ শিকল। একজন ডান হাতে আরেকজন বাম হাতে শিকল ধরে হাঁটে ও চলাফেরা করে। এরপর তাদের উপর চলে শাররীক নির্যাতন। এ অবস্থায় খুবই কষ্টে পাড় হচ্ছে তাদের শিক্ষা জীবন। তাদের অপরাধ মাদরাসা থেকে পালিয়ে যায়। পালানো রোধ করতেই শিক্ষকরা নিয়েছেন এ ব্যবস্থা। হাফেজিয়া শাখার শিক্ষকরা বলছেন এটাই নিয়ম। অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতেই এমনটা করা হয়েছে।

অথচ সরকার আইন করেছেন শ্রেণিকক্ষে কোন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করা যাবে না। ওই দুই শিশুই কসবা উপজেলার বাদৈর ইউনিয়নের শিকারপুর খালেক্বীয়া সুন্নিয়া হাফেজিয়া মাদরসার শিক্ষার্থী। রিমন পড়ছে কায়দা। নয়ন হাফেজি পড়ছে। এক পারা মুখস্তও করেছে নয়ন। গত শনিবার ঘড়ির কাটায় দুপুর ১টা ২০ মিনিট। ওই মাদরাসা মসজিদে যোহরের জামায়াতের বাকি মাত্র ৫ মিনিট। পুকুরের ঘাটে মুসল্লিরা ওজুতে ব্যস্ত।

সাথে রয়েছে মাদরাসার অনেক শিক্ষার্থী। বেশ শিক্ষার্থী পুকুরে পানিতে সাঁতার কাটছে মনের আনন্দে। ঠিক সেই সময় দেখা যায় শিকলে তালাবদ্ধ দুই শিক্ষার্থী খুবই কষ্টে ওজুর পানি পড়নের পাঞ্জাবি দিয়েই মুছার চেষ্টা করছে। সেই সাথে তাদের দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে। এক হাতে শিকল টানছে। আরেক হাতে মুছতেছে চোখের পানি। চোখে মুখে তাদের বিষাদের চাপ। পাশেই তাদের সহপাঠিরা খুবই উজ্জীবিত। সেই দৃশ্যও তারা উপভোগ করছে অপলক দৃষ্টিতে। এমন সময় তোমাদের পায়ে শিকল কেন? প্রশ্ন শুনেই অঝরে কাঁদতে শুরূ করে দুই শিশু শিক্ষার্থী। চোখ বড় করে ডানে বামে সামনে পেছনে তাকাতে থাকে।

অজানা আতঙ্ক যেন কুড়ে খাচ্ছে তাদেরকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে থাকে- ‘হুজুররা আমাদের পায়ে শিকল বেঁধে তালা দিয়েছেন। প্রসাব পায়খানা ওজু গোসল ও ঘুম সর্বাস্থায় আমরা তালাবদ্ধ থাকি। টয়লেটে গেলে একজনকে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যতক্ষণ তাদের একজনের টয়লেটের কাজ শেষ না হবে ততক্ষন অপরজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। খাবার নামাজও একসাথে হয়। আমাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয় নিয়মিত।

গত শুক্রবারে শুধু এমরান হুজুরই প্রত্যেককে ৪৬ টি করে বেত্রাঘাত করেছেন। এমন সময় তাদের সহপাটি ৩-৪ জন শিক্ষার্থী পাঞ্জাবি ওঠিয়ে নয়নের পিঠটি দেখায়। বেত্রাঘাতে নয়নের পিঠে লাল ও কালছে দাগ পড়েছে। অগণিত দাগ দেখা যায় রিমনের দুই পায়েও। তাদের অপরাধ মাদরাসা থেকে পালিয়ে যায়। অপরাধ স্বীকার করে দু’জনই বলে, গত দুই দিন ধরে চলছে আমাদের শিকলে বাঁধা জীবন। আমরা হুজুরদের বেত্রাঘাত থেকে রক্ষা পেতে চাই। সহপাঠিদের মত খোলামেলা ও মুক্ত ভাবে থাকতে চাই। ব্যবস্থা করে দেন স্যার। আমরা আর পালাব না। দুই শিশু ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে যায়, রিমন ও নয়ন দু’জনই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রিমন একই গ্রামের দাইমের পাড়ার মো. ইয়াবা মিয়ার ছেলে। আর নয়ন পুড়াবাড়ি এলাকার লেবানন প্রবাসী মো. রূবেল মিয়ার ছেলে।

মাদরাসার হাফেজি বিভাগের প্রধান হাফেজ মো. ইয়াছিন বলেন, জি অভিভাবকদের মতামতে দুই শিক্ষার্থীর পায়ে শিকল বেঁধে তালা দিয়েছিলাম। আজ খুলে দিয়েছি। এরা পালিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে মাইকিং করতে হয়। সকলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাই তালার ব্যবস্থা। এমরান হুজুর ৪৬টি বেত্রাঘাত করেননি। এটা শিক্ষার্থীরা সঠিক বলেনি। নয়নের অভিভাবকরা তাকে মারধর করেছেন। ওই মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বলেন, শিশু শিক্ষার্থীদের শিকলে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এমনটি আমার জানা নেই। বেত্রাঘাত করা সহ যে কোন অনিয়ম ধরার জন্য আমরা মাদরাসাতে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছি।

ডিঃব্রা// মাহবুব খান বাবুল

digital

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *