আইসোলেশনে থাকা এক চিকিৎসক বাবার অনুভতি

0

ডাক্তারের কোভিড সময়ঃ

#বাবা!! তোমাদের ঘরে একটু আসি। এক মিনিট।
#আম্মু!! তোমার কাছে আসতে খুব ইচ্ছা করছে।
#আম্মু!! আর ভালো লাগছেনা, আমি কি করবো?
#আব্বু! তুমি সারাদিন একটা ঘরের মধ্যে একা একা থাকো কিভাবে? আমার তো আর একা একা ভালো লাগেনা। আসি একটু।

সবকিছুর উত্তর: না। ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া ছোট্ট মেয়েটার আকুতি কখনও বুঝিয়ে শুনিয়ে, আবার কখনো শেষ পর্যন্ত ধমক দিয়ে দরজা বন্ধ করে সমাপ্ত হয়। নিষ্ঠুরতায় নিজেরও খারাপ লাগে।

আহারে!! বাচ্চাটা তো একটু কাছেই আসতে চেয়েছিল।

অকস্মাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া, দরজার কোণা দিয়ে তাকিয়ে থাকা নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকানো যে কি কষ্টকর, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বেচারীর ছোট্ট ব্রেনে তো এটা নেই, সামান্য উঁকি মারার দন্ড কতটা ভয়ংকর হতে পারে???

মাঝে-সাঝে বারান্দা দিয়ে পাশের ঘরের জানালায় লাইভ কনভারসেশন। তার ছবি কালার করা, নিজের গাছে পানি না দিলে কি করবে-তার হুমকি শোনা, অনলাইনে আনা পিৎজার গল্প, কয়েকদিন পর নানা নানু দাদু মামা-মামি সবাইকে নিয়ে একসাথে খেতে যাবে তার পরিকল্পনা শোনা।

মোবাইলেই মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেই,তার গায়ের গন্ধ নেই। যে মেয়ে আব্বু আম্মুকে জড়িয়ে ধরা ছাড়া ঘুমায় না- সেও এখন কোলবালিশ ধরে একা একা ঘুমাতে শিখে গিয়েছে। করোনার উপহার।

দশ মাসের ছেলেটা দিনের বেলা অন্য কারো কাছে থাকলেও রাতে মা ছাড়া আর কাউকে চেনে না। তাকে রাতে বারবার খেতে হয়। এতটুকুন বাচ্চা, দরজার বাইরে থেকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলা বাবা-মাকে দেখে প্রচন্ড আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ত, এই বুঝি, আব্বু আম্মু দুজন কোলে নেবে। চার পাঁচ দিনের মাথায় সে-ও বুঝে গেল; আব্বু আর আম্মু ওই ঘরে থাকা অবস্থায় চোখের দেখাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। প্রথম প্রথম মন খারাপ করলেও এই ১৫ দিনে সে ও বুঝে গিয়েছিল ডাকলে ও বাবা মাকে দেখতে পাবে,তবে ছোঁয়া বারণ। আস্তে আস্তে সেও বুঝদার মানুষের মত করা শুরু করেছে।

আমার বাচ্চাদের তো অন্তত নানা-নানু দেখেছেন, এ সময়ে ভাষাহীন অমানবিক পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু ভাবছি, যে মানুষগুলোর ঢাকায় আর কোনো সাপোর্ট নেই, তাদের আর বাচ্চাদের মানসিক অবস্থাটা কেমন?

এমন এক পরিস্থিতি আপনি ঘরে আছেন কিন্তু আপনার সন্তানেরা বাইরে কান্না করছে, অথচ তাদেরকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে পারছেন না।

কি নিদারুন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে বাচ্চাগুলো এই সময় পার করছে, তা কখনোই আপনি অনুভব করতে পারবেন না। কোথায় তাদের লেখাপড়া, কোথায় তাদের যত্ন-আত্মি, কোথায় পড়াশুনা- পরীক্ষা? এটা যে যন্ত্রনা সেটা বোঝার বয়সও তো হয়নি ওদের।

যন্ত্রনার দায়ভার আর কারো নয়; তাদের ডাক্তার বাবা-মার।

যে সন্তানটা প্রতিটা মুহূর্তে আপনাকে মিস করতে থাকে, করোনায় ডিউটিরত অবস্থায় প্রথম ৭দিন আপনাকে এমনিতেই পাবেনা, পরের ১৪ দিন বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন। এরপর মাত্র সাতদিনের জন্য বাচ্চাদের কাছে পাওয়া। এটাই ডাক্তার পরিবারের রুটিন।

আবার প্রতিটা মুহুর্তে একজন ডাক্তার, তার পরিবারের অন্য সব সদস্যের জন্য করোনার সাপ্লায়ার। বাহির থেকে প্রতিবার ঘরে ঢোকার সময় আপনার মনে হতে থাকবে, সাথে করে করোনা নিয়ে এলাম কি না?

ঘর শুধু নয়, নিজের অ্যাপার্টমেন্টের কোন অধিবাসীর অন্য কোন সোর্স থেকে ভাইরাস এলেও নিজেকেই প্রতিটা মুহূর্তে দায়ী মনে হতে থাকবে। প্রতিটা মুহুর্তে নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকবে।

এত কিছুর পরেও নির্মম সত্য কথা হচ্ছে। নিজে আক্রান্ত হলে টেস্ট করাতে পারবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

অধিকাংশ চিকিৎসক জানেন না; তিনি আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা কোথায় হবে? চিকিৎসকদের গণহারে মৃত্যু আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। প্রতিদিন গড়ে একজন বিদায় নিচ্ছেন। পরিচিত বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের গল্প শুনলাম যারা বাবা মাকে নিয়ে হাসপাতালে একটা বিছানার জন্য অশ্রু বিসর্জন করছেন।।। একইভাবে স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, ব্যাংকার সাংবাদিক সকলেই ঝুঁকির মধ্যে আছেন। সবাই এখন এক কাতারে।

অসুস্থতার কথা গোপন রাখায় একদিন সকালে ফোন করে আম্মা কাঁদছেন, কেন সবকিছু তাকে জানানো হয়না?? প্রশ্ন করেন, সুস্থ হয়ে আবার হাসপাতালে গেলে আবার এ রোগ হতে পারে কিনা?? আগামী কত মাস এই পরিস্থিতি চলবে- কে জানে এর উত্তর? বুঝি কি বলতে চান। মা তো! তারপরেও সন্তানকে তো মানা করতে পারবেন না যে হাসপাতালে যাবেনা।

এই যখন অবস্থা, যেখানে সবাই নিজের জীবন নিয়ে ছুটছে, সেখানে ডাক্তার আর তার পরিবারের অবর্ণনীয় মানসিক চাপ কি আর আলোচনার বিষয়? অনেক কলিগ এর চেয়েও অধিক সংগ্রাম করছেন। কিন্তু এর মধ্যেও হাসিমুখে চিকিৎসা দিচ্ছেন।

আলহামদুলিল্লাহ !! এখনো মন দুর্বল হয়ে যায়নি। এক বিন্দুও নয়। কারণ আমি জানি অজস্র মানুষের দোয়ার ভেতরেই আছি। এটাই ডাক্তারদের টিকে থাকার সবচাইতে বড় শক্তি।

প্রতিটা মুহূর্তে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চেয়ে যাচ্ছি।
🤲🤲🤲🤲🤲🤲🤲🤲🤲
হে অপরিসীম শক্তির আঁধার!!
হে করুণাময়!! পৃথিবীর প্রতিটি অন্তরাত্মার মালিক!
তুমিই শ্রেষ্ঠ অভিভাবক।
আমাদের পিতা মাতা, সন্তান, পরিবারের জন্য তুমিই যথেষ্ট।
তুমিই তো আমাদের ডাক্তার বানিয়েছ।
সাহস দাও!! শক্তি দাও। মনোবল দাও।
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন মানুষের কল্যাণে দৃঢ়তা নিয়ে টিকে থাকতে পারি।

 

ডা. মুহিব্বুর রহমান রাফে

কনসালটেন্ট
ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন
সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, ঢাকা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে