বুধবার , ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ,১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

অবশেষে ভাংচুর লুটপাটের মূল হোতা ত্রাস আকবর গ্রেপ্তার

 অবশেষে ভাংচুর লুটপাটের মূল হোতা ত্রাস আকবর গ্রেপ্তার

ডিঃব্রাঃ
আকবর আলী (৪৫)। নাম শুনলেই আতকে ওঠেন ওই জনপদের মানুষ। বাড়ি উপজেলার পাকশিমুলে। অনেক অপকর্মের হোতা এই আকবর। ওই এলাকায় ত্রাস আকবর হিসেবেই পরিচিত সে। লাঞ্ছিত ও প্রাণনাশের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাননি কেউ। সম্প্রতি দেলোয়ার নামের এক যুবকের খুনকে পুঁজি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে সে। রয়েছে নারী নির্যাতনেরও অভিযোগ।

মামলার চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় সপ্তাহ দিন আগে মলু মিয়া (৩০) নামের এক লোককে তার অফিসে এনে পিটিয়েছে। আকবরের লোলুপ দৃষ্টির কারণে ২ বোনের ইজ্জত রক্ষায় চরম বেকায়দায় থাকার কথা জানিয়েছেন এক ভাই। আকবরের বিরূদ্ধে ১ কোটিরও বেশী টাকা মূল্যের মালামাল লুটের অভিযোগে থানায় মামলা করেছেন আয়েশা নামের এক মহিলা। অবশেষে গত শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে সেই আকবরকে গ্রেপ্তার করেছে সরাইল থানা পুলিশ। আকবর গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলেছেন পাকশিমুল ও অরূয়াইলের নারী পুরূষ।

পুলিশ, মামলার এজহার ও স্থানীয় ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, রহমত আলীর ছেলে আকবর। পড়েছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। কিশোর কাল থেকে উশৃঙ্খল ছিল সে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেপরোয়া হতে থাকে। বড় গোত্রের সদস্যই তার শক্তির উৎস। এক সময় সালিসকারকের তকমা লাগান। ফাঁকে সুদের ব্যবসা। জুয়ার আসরে চড়া সুদে টাকা দেয়ায় আকবরের জুড়ি নেই। এক সময় মোতালিব মেম্বারের নেতৃত্বে আকবর গড়ে তুলে শক্তিশালী একটি গ্রূপ। ডাকাত দলের একাধিক সদস্যের তার রয়েছে গভীর সম্পর্ক।

দাঙ্গা জুয়া মাদক ছিনতাই চাঁদাবাজি সবকিছুতেই পটু আকবর। পুলিশের সাথে সখ্যতার দোহায় দিয়ে দালালি তার আরেক পেশা। দীর্ঘ দিন ধরে নদী দখল করে প্রকাশ্যে করছে বালুর ব্যবসা। গত ৭ মার্চ এক ঘটনায় মোতালিব মেম্বারের গোত্রের সিএনজি চালক দেলোয়ার খুন হয়। ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে প্রধান আসামী করে ৩৮ জনের বিরূদ্ধে দেয়া হয় হত্যা মামলা। গ্রামছাড়া হয়ে পড়ে আসামী ও তাদের স্বজনরা।

সুযোগে আকবর ও ইউপি সদস্য মোতালিবের নেতৃত্বে আসামী ও তাদের স্বজনদের বাড়ি ঘরে চলছে ভাংচুর লুটপাট। পুরূষ শুন্য পরিবারের নারীদের প্রতি মূহুর্ত কাটছে নিরাপত্তাহীনতায়। ইতিমধ্যে একজন নারী নির্যাতনের অভিযোগও ওঠেছে। প্রতিপক্ষের তান্ডবের ভয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার এখন বাড়ি ছাড়া। মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে চলছে টাকা কামাই। জমির ধান কাটতে গুণতে হচ্ছে টাকা। তবে সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম বলেন এসব মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনার দিন উত্তেজিত লোকজন সামান্য ভাংচুর করেছিল।

এরপর আর কিছু হয়নি। সরজমিনে দেখা যায়, জনমানব শুন্য বসত ঘর গুলো অগণিত হত চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা জানালা ভাঙ্গা। বেড়ার টিন গুলো কোথাও কাটা। কোথাও ফুটো। কক্ষ গুলো একেবারে ফাঁকা। কোন মালামাল নেই। কাঁচের ভাঙ্গা টুকরোতে সয়লাব মেঝগুলো। অনেক কক্ষে কুকুর ঘুমোচ্ছে। চারিদিকে কিছু বৃদ্ধ মহিলা ঘুরছেন। কানাকানি করে কথা বলছেন। মলিন মুখে চারিদিকে তাকাচ্ছেন। হঠাৎ কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মীর উপসি’তিতে তারা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। কিছু একটা বলতে চাচ্ছেন। কিন’ ভয়। প্রতিপক্ষের কেউ দেখে ফেলবে। ফলে রাতে নির্যাতনের শিকার হতে হবে।

হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালেন ৮০ উর্ধ্ব বয়সের এক মহিলা। পরে মারধরের ভয়ে নাম বলতে নারাজ তিনি। আবুনি বেগমের শরীর কাঁপছে। চোখের জল ছেড়ে দিয়ে বললেন, আরেকটা একাত্তর দেখছি। দেলোয়ার নিহত হওয়ার পরই রাতে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে ফেলে। সকল মালামাল লুটে নেয়। ছেলে বউরা বাচ্চা হাচ্চা নিয়ে কোন রকমে পালিয়ে বাঁচে। সকালে জেনেছি আরো বাড়িতে এমন হামলা হয়েছে। প্রতিদিন রাতেই তারা দল বেঁধে আসে। খাবার ভেতরে যায় না। রাতে ঘুমোতে পারছি না। এখন দিনের বেলা অন্যের বাড়িতে থাকি। আরেক বৃদ্ধ মহিলা (৬০) বলেন, বাবারে কথা বলছি দেখলে বাড়িতে থাকতে পারব না। কার ধান কে কাটছেন। কানি প্রতি ৪-৫ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে।

ডজনের ডজন গরূ নিয়ে যাচ্ছে। টাকা দিলে আবার ফেরৎ দিচ্ছে। অনেক মহিলা নিরবে কাঁদছেন। লজ্জায় মুখ খুলছে না। সব কথা খুলে বলতে পারব না। এই আলামত শেষ হবে কবে? আমরা কবে শান্তি পাব? হত্যা ও মামলার পরবর্তী সময়ে এমন তান্ডব বিরাজ করছে পাকশিমুল গ্রামে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নারী পুরূষ বলেন, আসামী হওয়া ও বাড়িঘর রক্ষার দোহাই দিয়ে ইউপি সদস্য মোতালিব, নদী দখল করে বালুর ব্যবসায়ি আকবর ও শাহেদ আলীর নেতৃত্বে চলছে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজী।

আকবরকে অনেকে পুলিশের সোর্স হিসেবে চিনেন। চাঁদার পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত। প্রকাশ করলে দেয়া হচ্ছে মারধরের হুমকি। কয়েকজন গৃহবধূকে পানিতে ফেলে স্বাসি’ও দেয়া হয়েছে। একাধিক নারীর উপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। অনেক নিরীহ লোকজনকেও বাড়িতে আসতে টাকা গুণতে হচ্ছে। অনেকে টাকা দিয়েও আসতে পারছেন না। ছাদেক মিয়া নামের এক ব্যক্তি তার ভাগিনা রেজাউলের মাধ্যমে মোতালিব মেম্বারের কাছে ৬০ হাজার টাকা পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। এমন আরো অনেকেই রয়েছেন তারা ভয়ে মুখ খুলছেন না। জনৈক ব্যবসায়িকে গুণতে হয়েছে ৫ লাখ টাকা।

তিনিও চরম আতঙ্কে আছেন। ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোতালিব বলেন, চাঁদাবাজী ও ভাংচুরের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। আমাদের কোন লোক এ ঘটনার সাথে যুক্ত নয়। তারা নিজেদের মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে ভূয়া অভিযোগ করছেন। হত্যা মামলার বাদী নাজমা বেগম বলেন, আসামীর সংখ্যা আমি বলতে পারব না।

আমি অসুস’্য। অবশেষে আয়েশা বেগম নামের এক মহিলা ১৭ বাড়ি ভাংচুর লুটপাট করে ২ কোটিরও অধিক টাকা মূল্যের মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগে আকবরকে প্রধান আসামী করে মোট ১২ জনের বিরূদ্ধে সরাইল থানায় একটি এজহার জমা দিয়েছেন। এজহার জমা দেয়ার পরই গত শুক্রবার রাতে পাকশিমুলে অভিযান চালিয়ে ত্রাস আকবরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ভাংচুর লুটপাট হয়েছে যাদের বাড়ি: হত্যা কান্ডের পর আসামী পক্ষের বসত ঘরে আকবরের নেতৃত্বে চলে ভাংচুর অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। আকবর তান্ডবে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন যারা। তারা হলেন- লম্বাহাটি এলাকার নোয়াজ আলী, মহব্বত আলী ও তাজু মিয়া। আগুনে পুড়িয়েছে বালুর মাঠ এলাকার আবুল মিয়া ও পলা মিয়া। সড়কের পাশের তমিজ উদ্দিন, আজম উদ্দিন, জাহেদ আলী, মুস্তব আলী, শের আলী, হরজত আলী, মাসুক মিয়া, আসিদ মিয়া ও আব্দুর রশিদের বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে।

প্রসঙ্গত: ইউপি সদস্য মোতালিব ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান সাইফুলের ঘনিষ্টজন। বছর দিন আগে বিরোধপূর্ণ কোটি টাকা মূল্যের ২৫ শতক জায়গা ক্রয় করে ঝামেলার সৃষ্টি করেন। এ ঘটনায় চেয়ারম্যন সঠিক কথা বলায় বেঁকে বসেন মোতালিব মেম্বার। তিনি চলে যান আবুল কাশেমের দলে। আধিপত্য ও নির্বাচনকে ঘিরে সাইফুল ইসলাম ও কাশেমের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। গত ৭ মার্চ এক সংঘাতে মোতালিব মেম্বারের গোত্রে দেলোয়ার খুন হয়। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান সাইফুলকে প্রধান আসামী করে মোট ৩৮ জনের বিরূদ্ধে হত্যা মামলা হয়। রয়েছে গংও। চেয়ারম্যান এখন এলাকা ছাড়া।

মাহবুব খান বাবুলঃ

digital

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *